ভক্তিবাদ ও কিছু কথা
ভক্তিবাদঃ (১)
------------
‘ভ্রান্ত গরিমা দরজায় তালা দিয়ে দেয়, ভক্তি আর ভালোবাসার
চাবি দিয়েই তাকে খুলতে হয়’
সংস্কৃত ‘ভজ্’ ধাতু থেকে ভক্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি। ভক্তির মূল কথা ঈশ্বরের প্রতি অশেষ অনুরাগ। বাউল কবি সেজন্য বলেন, ‘জ্ঞানের অগম্য তিনি প্রেমের ভিখারী।’ অপরদিকে ‘নিত্য তোমারে চিত্ত ভরিয়া স্মরণ করি’ সম্ভবত ভক্তির চরম কথা। হিন্দু ধর্মে ভক্ত কর্তৃক আপন দেবতাকে পুজা অর্চনার বদলে বিনত-ভালবাসার মাধ্যমে দেবতার নিকট আত্মোৎসর্গই ভক্তি।
একটা সময় ধর্ম বদ্ধ
ছিলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে । বলা যায় মন্দির ভিত্তিক । সেখানেই পূজা যজ্ঞও হতো , আবার অনেক সময় রাজদরবারে যজ্ঞ হতো ।
সেই পূজা ও যজ্ঞগুলো করার অধিকার ছিলো সমাজের উচ্চশ্রেণীর হাতে । সাধারণ মানুষ এর
জন্য তা ছিলো নাগালের বাহিরে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের
একটা উক্তি আছে পদ্মানদীর মাঝিতে , সেখানে কুবের বলছেন “ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে- এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। “
এই ভদ্রপল্লী থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে নিয়ে
আসার কাজগুলো করেছিলেন নানা সময়ে নানা মনীষি গণ ।
একটা সময়ে ধর্মপ্রচারক গন একটি কোনও মন্দিরে আবদ্ধ
থাকতেন না। বিভিন্ন ধারার সঙ্গে খোলামেলা বিতর্কে সামিল হতেন। এরই পাশাপাশি নিজ
নিজ ভক্তকুলকে সঙ্গে নিয়ে এক এলাকার মন্দির থেকে অন্য এলাকার মন্দিরে পরিক্রমা
করতেন। তারা যাত্রাপথে একসঙ্গে নাচতেন এবং গাইতেন। ক্রমশই এর মধ্যে দিয়ে এক নতুন
ধরনের গণচরিত্রের বিকাশ ঘটে। ধর্মভিত্তিক এই গণচরিত্রের আন্দোলনের চেহারাটি
ক্রমশ সারা ভারতে ছড়িয়ে যায়। একেই আমরা
চিনি ভক্তি আন্দোলন বলে।
ভক্তি আন্দোলনের গণচরিত্র
অর্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল সঙ্গীত ও সহায়ক বাদ্যযন্ত্র। ধর্মপ্রচারকদের
অধিকাংশই ছিলেন কবি ও গায়ক। তাদের দেওয়া
সুরে তালের প্রয়োগ ছিল খুব আকর্ষণীয়। ভক্তি আন্দোলনের গণচরিত্র অর্জনের ক্ষেত্রে
নাচেরও বিশেষ প্রভাব ছিল। সমবেত নাচের নির্দিষ্ট আদলটি ধর্ম প্রচারকরা নিয়েছিলেন
লোকনৃত্যের আঙ্গিক থেকে।
ভক্তিবাদী সাধকগণ তাদের উপদেশ ও
মনের কথা ব্যাক্ত করতেন স্থানীয় ভাষায় । ফলে আঞ্চলিক ভাষাগুলো নবীন মর্যাদায় ভুষিত
হয় এবং তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ।বাংলার ভক্তিবাদীগন
তো বাংলাভাষাকে নবযৌবন দান করেছিলেন ।
ভক্তিবাদী আন্দোলনে বা ভক্তিবাদী
মতবাদে নারী ও পুরুষদের অবাধ যাতায়াত ছিলো । ফলাফল সেখানে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি
পায় ।
ভক্তিবাদ ও কিছু কথা
সংস্কৃত ‘ভজ্’ ধাতু থেকে ভক্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি। ভক্তির মূল কথা ঈশ্বরের প্রতি অশেষ অনুরাগ। বাউল কবি সেজন্য বলেন, ‘জ্ঞানের অগম্য তিনি প্রেমের ভিখারী।’ অপরদিকে ‘নিত্য তোমারে চিত্ত ভরিয়া স্মরণ করি’ সম্ভবত ভক্তির চরম কথা। হিন্দু ধর্মে ভক্ত কর্তৃক আপন দেবতাকে পুজা অর্চনার বদলে বিনত-ভালবাসার মাধ্যমে দেবতার নিকট আত্মোৎসর্গই ভক্তি।
‘ভ্রান্ত গরিমা দরজায় তালা দিয়ে দেয়, ভক্তি আর ভালোবাসার
চাবি দিয়েই তাকে খুলতে হয়’
পঞ্চদশ শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের মধ্যে সঙ্ঘর্ষের
পটভূমিকায় সমন্বয়ী বার্তাটি যার মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল তিনি হলেন
কবীর। দুটি ধর্মেরই অর্থহীন আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডগুলিকে তিনি আক্রমণ করেন এবং দুটি
ধর্মেরই পরম লক্ষ্য যে এক এবং অভিন্ন তা তিনি বলবার চেষ্টা করেন। একদিকে তিনি যেমন
কুসংস্কারমূলক ধর্মবিশ্বাসগুলির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছিলেন, তেমনি অন্যদিকে আচরণে
কঠোর নীতিনিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। কবীর ছিলেন হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচক।
প্রতিমা পূজার বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের অবতারবাদের বিরুদ্ধে, পুণ্যসলিলা নদীসমূহে স্নান করলে
স্বর্গলাভ হয়— এই সমস্ত ধারণার বিরুদ্ধে তিনি অবিরাম লড়াই করে গেছেন। মসজিদের প্রতি
অন্ধ আনুগত্যেরও তিনি সমালোচক ছিলেন।
দেখা যায় , পৃথিবীর বড় বড় মহামনীষীদের বেশীর ভাগ মানুষ নিরক্ষর ছিলেন । তারা তাদের মতবাদ প্রচার করেছেন নিজের বিশ্বাসের উপর ভর করে । ফলে দেখা গেছে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তারা তাদের মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে সমসাময়িক শিক্ষিত ও পণ্ডিত শ্রেনীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।
সন্তু কবির বলতেন ,
মেরে তেরে মনুয়া ক্যয়সে এক হোই রে
মে কথা হুঁ আঁখি দেখি
তু কথা হ্যায় কাগজ কী লেখি—
অর্থাৎ পণ্ডিতদের সঙ্গে তার চিন্তার মিল হবে কী করে? তাঁদের কথা তাঁদের পবিত্র সব বই থেকে উদ্ধৃত আর তাঁর কথা তাঁর নিজ উপলব্ধিজাত। বস্তুতপক্ষে অভিজ্ঞতা নির্ভর আত্মোপলব্ধিকে ধর্মীয় প্রথার ওপরে স্থান দেওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আত্মগরিমার জায়গায় এক উদার মনোভাবকে প্রচার করাটাকেই তাদের এত বিশিষ্ট করে তুলেছে।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের মধ্যে সঙ্ঘর্ষের পটভূমিকায়
সমন্বয়ী বার্তাটি যার মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল তিনি হলেন কবীর। দুটি
ধর্মেরই অর্থহীন আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডগুলিকে তিনি আক্রমণ করেন এবং দুটি ধর্মেরই পরম
লক্ষ্য যে এক এবং অভিন্ন তা তিনি বলবার চেষ্টা করেন। একদিকে তিনি যেমন কুসংস্কারমূলক
ধর্মবিশ্বাসগুলির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছিলেন, তেমনি অন্যদিকে আচরণে কঠোর নীতিনিষ্ঠার
ওপর জোর দিয়েছেন। কবীর ছিলেন হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচক। প্রতিমা পূজার
বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের অবতারবাদের বিরুদ্ধে, পুণ্যসলিলা নদীসমূহে স্নান করলে স্বর্গলাভ
হয়— এই সমস্ত ধারণার বিরুদ্ধে তিনি অবিরাম লড়াই করে গেছেন। মসজিদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যেরও
তিনি সমালোচক ছিলেন।
একটা সময়ে ধর্মপ্রচারক গন একটি কোনও মন্দিরে আবদ্ধ
থাকতেন না। বিভিন্ন ধারার সঙ্গে খোলামেলা বিতর্কে সামিল হতেন। এরই পাশাপাশি নিজ
নিজ ভক্তকুলকে সঙ্গে নিয়ে এক এলাকার মন্দির থেকে অন্য এলাকার মন্দিরে পরিক্রমা
করতেন। তারা যাত্রাপথে একসঙ্গে নাচতেন এবং গাইতেন। ক্রমশই এর মধ্যে দিয়ে এক নতুন
ধরনের গণচরিত্রের বিকাশ ঘটে। ধর্মভিত্তিক এই গণচরিত্রের আন্দোলনের চেহারাটি ক্রমশ সারা ভারতে ছড়িয়ে যায়। একেই আমরা চিনি ভক্তি
আন্দোলন বলে।
ভক্তি আন্দোলনের গণচরিত্র
অর্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল সঙ্গীত ও সহায়ক বাদ্যযন্ত্র। ধর্মপ্রচারকদের
অধিকাংশই ছিলেন কবি ও গায়ক। তাদের দেওয়া
সুরে তালের প্রয়োগ ছিল খুব আকর্ষণীয়। ভক্তি আন্দোলনের গণচরিত্র অর্জনের ক্ষেত্রে
নাচেরও বিশেষ প্রভাব ছিল। সমবেত নাচের নির্দিষ্ট আদলটি ধর্ম প্রচারকরা নিয়েছিলেন
লোকনৃত্যের আঙ্গিক থেকে।
Comments
Post a Comment