” জীবন প্রেমের ফষল। আর প্রেম হলো ”মা”।”
কবি নজরুল বলেছিলেন
সৃষ্টিরে মা রয় আবরি'
সেই মা নাকি দিগম্বরী?
আমার মা দিগম্বরী, বসনহীন।
কেননা ঈশ্বর সর্বব্যাপী, সর্ববৃহৎ তাকে আচ্ছাদিত করার মতো আর বৃহৎ কিছু নেই। তাই মা বসনহীন। এই আচ্ছাদন অবিদ্যা ও অহং এর প্রতীক। সকল অবিদ্যা, মোহ ও অহমিকার আচ্ছাদন পরিত্যাগ করলে তবেই ঈশ্বরের দেখা মেলে।
"Sri Ramakrishna and Lord Jesus are twin of the spiritual womb and The Kali Mother and The god are same" মাক্স মুলার ।
আমার মা সংহারমূর্তি প্রতীক । বলা হয় মা কালীল মূর্তি সংহারকারীণি মূর্তি। সংহারের প্রকৃত অর্থ- সংহরণ, নিজের ভেতর প্রত্যাকর্ষণ। যেমন সমুদ্র থেকে উৎপন্ন ঢেউ সমুদ্রেই লীন হয়, যেমন মাকড়সা স্বীয় জাল ইচ্ছানুসারে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে নিতে পারে তেমনি। জেলে যেভাবে জাল বিস্তার করে পুনরায় নিজের দিকে টেনে নেয় তেমনি। অর্থাৎ এই সংহার মানে পুনসৃষ্টি কেবলই ধ্বংস নয়। এই সংহার অর্থ নির্ভয় আশ্রয় মাতৃকোলে ও মাতৃবক্ষে সন্তানের প্রত্যাবর্তন। নিখিল সৃষ্টি বিশ্বপ্রসবিণী মায়ের উদর হতেই আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমরা সেখানেই ফিরে যাই।
‘মা’ আমার কালের মধ্যে মহাকালী; সীমার মধ্যে অসীম। সন্তানের পৃথিবী মা নাও হতে পারে, কিন্তু মাতার পৃথিবী সন্তান। সন্তান মাকে ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু মা কখনো সন্তান ছাড়েন না।
কাল শূন্যের অনুরূপ ও আচ্ছাদনবিহীন বলে তাকে শ্বেতকায় ও দিগম্বর বলা হয়েছে। মহাদেবকে আদিদেব বলার তাৎপর্য এই যে, সবার আগেও কাল বিদ্যমান ছিল। সবই কালে ঘটছে। সুতরাং মহাদেব সর্বজ্ঞ, কালেই জ্ঞানলাভ হয়, সুতরাং তিনি জ্ঞানদাতা, এবং যশস্বী মহাত্মাদের কাল বাঁচিয়ে রাখে, সুতরাং তিনি ভক্তমুণ্ডমালী। যিনি শিব তিনিই কালী তাইতো তিনি মহাকালী ।
আমার পিতা দেবাদিদেব মহাদেব বৃদ্ধ কিন্তু আমার মা “ উমা ” নিত্যযৌবনা, এর তাৎপর্য এই যে সময় একবার গেলে আর ফেরে না এবং তার বয়সেরও অন্ত নেই। কিন্তু পৃথিবী প্রতি বছর অভিনব বেশ ধারণ করে ও একবার বসন্ত শেষ হলেও তা বার বার আসতে থাকে।
মা আমার দৈবী মায়া, আসুরিক মায়া, ত্রিগুনাত্রিকা মায়া, মায়া ও মহামায়া এবং যোগমায়ার সংমিশ্রণ।
কে বলে মোর মা-কে কালো,
মায়ের হাসি দিনের আলো
==========================
'কাল' অর্থাত্ সময়ের জন্মদাত্রী, পালনকর্ত্রী এবং প্রলয়কারিণী নিয়ন্ত্রক বলেই দেবীর নাম 'কাল' যুক্ত 'ঈ' - 'কালী'। 'ঈ' কারের সৃষ্টি ও শব্দোচ্চারণ হয়েছে 'ঈশ্বরী' বা সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মকে উপলব্ধি করার জন্য। এ সব অত্যন্ত গুরু তত্ত্ব।
কাজী নজরুল ইসলাম গেয়ে উঠলেন,
"কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন"।
==================================
সৃষ্টির এক পর্যায়ে এসেছে 'জীবন'। জীবনের অন্তঃস্থ সৃষ্টি হল 'মন'। মনের মধ্যে সৃষ্টি হল 'আনন্দ'। আনন্দের বিকাশ হল 'জ্ঞান' - জ্ঞানই হল সত্ত্ব। আর সেই সত্ত্বজ্ঞানের অধিষ্ঠান হল 'চিত্' - মনের সূক্ষ্মদেহ। এক কথায় 'সচ্চিদানন্দ' - তিনিই শিব - মহাজ্ঞান - শ্বেতবর্ণধারী। আদি আদ্যাক্ষরী মা কালীর পদতলে সেই দেবাদিদেব।তাই কবি বলতে চেয়েছেন পায়ের তলায় ঞ্জানের আলো ।
“কে পরালো মুণ্ডমালা আমার শ্যামা-মায়ের গলে।“
===============================
মা আমার বাগীশ্বরী, শব্দব্রহ্মময়ী। তার কণ্ঠে পঞ্চাশ মুণ্ড, পঞ্চাশটি বর্ণের প্রতীক। জগতের সকল জ্ঞান ও তত্ত্বের প্রকাশ হয় এই বর্ণ তথা ধ্বনির মাধ্যমে। মা সকল জ্ঞানশক্তির আধার তাই তার গলায় মুণ্ডমালা। মস্তিষ্ক হচ্ছে জ্ঞানের আধার। মায়ের হাতে ঝুলন্ত মস্তিষ্ক আমাদের জ্ঞানশক্তিতে বলিয়ান হতে শিক্ষা দেয়। জ্ঞান দ্বারাই আমরা অজ্ঞানকে ছেদন করতে পারি।
মায়ের কটিদেশে কাটা হাত। হাত হচ্ছে কর্মের প্রতীক। জীবের জন্ম-জন্মান্তর প্রক্রিয়া এই কর্মের দ্বারাই নির্ধারিত। সকাম কর্ম বন্ধনের কারণ তাই কর্তিত হাত মায়ের যোনিদেশের কাছাকাছি। অর্থাৎ সকাম কর্মকে পরিত্যাগ না করতে পারলে জন্মান্তর অবশ্যম্ভাবী। একারণেই মা ছিন্ন হস্ত কটিদেশে ধারণ করে আছেন।
বামাক্ষ্যাপা
========
বামাক্ষ্যাপার ঈশ্বর ছিলেন ‘তারা’ মা। তারা-মাকে তিনি ডাকতেন ‘বড় মা’ বলে। জন্মদাত্রী মাকে ডাকতেন ‘ছোট মা’ বলে। মন্দিরের নিয়মকানুন মানতেন না। একদিন বড় মার নৈবেদ্য খেয়েছিলেন। মন্দিরের পুরোহিতরা প্রহার করেছিল খুব। কথিত আছে, বড় মা তখন ছোট মার রূপে প্রকট হয়ে তাকে আদর করেছিলেন। সব ঘরেই ছোট মার রূপে রয়েছেন বড় মা- পরমাপ্রকৃতি।(উৎস- ড. এমদাদুল হক )
বাল্মীকির রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনো বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণের পদ্যানুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এর কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন। কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। শিব তাঁকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী দুর্গার পূজা করে তাঁকে তুষ্ট করতে। তাতে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে।
বেদ পূর্ব অসুর কথাটি ব্যবহার হতোনা । অসুর শব্দটি নিয়ে এনেছে আর্য্যরা । ইরানের অহুর শব্দটি থেকে অসুর কথাটির উৎপত্তি । অহুর শব্দের অর্থ উপাস্য দেবতা । উচ্চারণ গতসমস্যার কারনে সিন্ধু নদীর অববাহিকায় অহুর অসুরে পরিণত হয় , যেমন সিন্ধ হয়ে যায় হিন্দ । বেদে অনেক দেবতাকে অসুর বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অসুর একদা পদবী হিসাবেও ব্যবহার হতো। আসামে নারকাসুর তার একটা বড় উদাহরণ । কালক্রমে সুর ও অসুর তথা ভাল ও খারাপ অর্থে ব্যবহার হতে থাকে।
বেদপূর্বও ভারতবর্ষে ধর্ম ছিল । হরোপ্পা সভ্যতায় হর দেখা যায় । সেখানে মাতৃকা দেবীকে দেখা যায় । ভারতবর্ষের আদি দেবতা বলুন আর ভগবান ভগবতী বলুন তা হলো শিব দূর্গা । বেদে শিব নেই । অনেকে একে রুদ্র বলে চালিয়ে দিয়েছেন । এটা খুব একটা গ্রহণ যোগ্য হয় নাই। তাই বলা হয়ে থাকে রুদ্র শিবের একটি রুপ। বেদ অনেক চেষ্টা করেও ভারতবর্ষ থেকে শিবকে মুছতে পারে নাই। তাই তারা একপর্য্যায়ে শিবকে দেবাদিদেব উপাধি দিয়েছেন। কিন্তু ভারতবর্ষে এখনও অনেক প্রদেশ আছে যেখানে শিবকে স্বয়ং ভগবান বলা হয় আর স্ত্রী অর্থে দূর্গাকে তারা ভগবতী মেনে থাকেন । বেদে পুরুষদের প্রভাব বেশী । বেদে যে ৩৩ প্রকার দেবতার কথা আছে সেখানে শিব অনুপস্থিত। তবে বিষ্ণু ইন্দ্র এদের প্রভাব বেশী । এরা সবাই অদিতির সন্তান।
বেদে দূর্গাকে দেখাই যায় না । কোন কোন জায়গায় বলা হয়ে থাকে বিষ্ণুর শরীর থেকে মায়াদেবীর উৎপত্তি । সেই দুর্গা। কিন্তু এটাও খুব একটা গ্রহন যোগ্যতা পায় নাই। বঙ্গদেশেতো নয় । বরং বংগ দেশে মা দূর্গা/কালীকে স্বয় বিশ্বসৃষ্টিকারিনী রুপে দেখা হয়েছে। মা সব।
বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন নীচের অপরাজিতা দৈনিক পত্রিকাতেঃ-