অপরাজিতা দৈনিক পত্রিকা
সনাতন শাস্ত্র মতে আমরা যে শ্রী কৃষ্ণকে জানিঃ-
ভগবানের সংজ্ঞা-
ভগবানের একটি সরল সংজ্ঞা হচ্ছে : ‘জন্মাদাস্য য্তঃ’ – “যাঁর থেকে সমস্ত প্রকাশিত হয়” (ভা: 1/1/1)৷ ‘ভগবান’ শব্দটি সংস্কৃত, এবং এর অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি- “(১) সমগ্র ঐশ্বর্য (ধনসম্পদ), (২) সমগ্র বীর্য (শক্তিমত্তা), (৩) সমগ্র য্শ, (৪) সমগ্র শ্রী (সৌন্দর্য, রূপবত্তা), (৫) সমগ্র জ্ঞান ও (৬) সমগ্র বৈরাগ্য যাঁর মধ্যে পূর্ণ-রূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান ৷” ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ছয়টি ঐশ্বর্য (ষড়ৈশ্বর্য ) এবং ‘বান’ শব্দের অর্থ যুক্ত বা সমন্বিত৷ যেমন জ্ঞানবান অর্থ জ্ঞান-সমন্বিত, ধনবান শব্দের অর্থ ধন-সমন্বিত, তেমনি ভগবান শব্দের অর্থ যিনি সম্পূর্ণভাবে ৬টি ঐশ্বর্য সমন্বিত৷ ঐ সমস্ত ঐশ্বর্য অন্যকে আকর্ষণ করে- আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার এটিই রহস্য৷ কারও যে-পরিমাণে এই ঐশ্বর্য থাকে, তিনি ততটাই আকর্ষণীয় হন৷ এজগতে সকলেরই ঐসব ঐশ্বর্য কিছু কিছু পরিমাণে রয়েছে- কিন্তু কেউই সমগ্র ঐশ্বর্য-সম্পন্ন নয়৷ অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা অত্যন্ত ধনবান, খুব বলবান, খুব রূপবান, অত্যন্ত য্শস্বী, খুব জ্ঞানী এবং অত্যন্ত বৈরাগ্যবান, কিন্তু কেউই দাবী করতে পারে না যে তাঁর সমগ্র ধনৈশ্বর্য , সমগ্র বলবত্তা, সমগ্র সৌন্দর্য ইত্যাদি রয়েছে- একমাত্র ভগবানেরই এগুলি পূর্ণমাত্রায় রয়েছে৷ উপরোক্ত ছয়টি ঐশ্বর্য যাঁর পূর্ণ মাত্রায় আছে, তিনি নিশ্চয়ই ‘সর্বাকর্ষক’৷ সংস্কৃত ভাষায় সর্বাকর্ষক শব্দের সমতুল শব্দ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’৷
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিজেই শ্রী গীতাতে বলছেনঃ
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।৪/৯।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
তাই ভগবানের জন্ম ও কর্ম সম্পর্কে আমাদের তত্ত্বগত ভাবে জানা প্রয়োজন ।
সেটা দ্বাপর যুগের ঘটনা। মগধের অধিপতি জরাসন্ধ ছিলেন এক রাজ্যলোভী রাজা। তিনি ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। আর সেই ব্যর্থ রাজা জরাসন্ধ গ্লানিতে অস্থির-উন্মাদ হয়ে শেষে আশ্রয় নেন এক কুটকৌশলের। মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র অত্যাচারী কংসকে নিজ দলে ভিড়িয়ে তার নিজের দুই মেয়েকে কংসের সাথে বিবাহ দেন হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য।
কংসের সিংহাসন লাভের দুর্বিনীত আকাক্ষার ফলে জরাসন্ধের সাথে এই আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন হয়। ফলে জরাসন্ধ ও কংস দুজনেই অনেকাংশে বলশালী হয়ে উঠেন। অন্যদিকে তাদের এই উত্থানে মথুরাবাসী উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। কারণ মথুরাবাসী ছিল অত্যন্ত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী। বিশেষকরে যাদবরা তাদের চিরশত্রু জরাসন্ধের সঙ্গে কংসের এ আত্মীয়তার বন্ধনকে মনে মনে ধিক্কার জানান। মনেপ্রাণে তারা হয়ে ওঠেন আরো বিদ্রোহী।
এদিকে ক্ষমতালোভী কংস পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে মথুরার সিংহাসন দখল করেন। তখন আত্মীয়-স্বজন বিশেষকরে যাদবকূল বিদ্রোহী হয়ে উঠে। এ অবস্থায় তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ প্রশমনের কৌশল হিসেবে কংস যাদবকূলের শুর সেনের পুত্র, বিশ্বস্ত বন্ধু বসুদেবের সাথে নিজ বোন দেবকীর বিবাহ দেন। কিন্তু ক্রমে কংসের আশা দুরাশায় পরিণত হয়।
সদ্য পরিণীতা বোন দেবকীকে বসুদেবসহ রথে করে নিয়ে যাবার সময় কংস এই দৈববাণী শুনতে পান – ‘তোমার এই বোনের অষ্টম সন্তানই হবে তোমার মৃত্যুর কারণ।’ মৃত্যুর আশংকায় ভীত কংস সে সময়ই দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলে বসুদেব কংসকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, দেবকীর উদরে যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে তিনি কংসের হাতে তুলে দেবেন। এ কথায় আশ্বস্ত হয়ে কংস বোন দেবকীকে তখন হত্যা করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু বোন ও ভগ্নীপতিকে তক্ষুনি কারাগারে নিক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করেননি।
কৃষ্ণ ছিলেন বিষ্ণুর অবতার। স্বয়ং নারায়ণ দেবকীর গর্ভে নিজের কৃষ্ণ কেশ নিক্ষেপ করেছিলেন, সেখান থেকেই কৃষ্ণের (কেশব) জন্ম।
এর দশ মাস দশদিন পর দেবকী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।সঙ্গে সঙ্গে কংসের হাতে তুলে দেন বসুদেব তার সদ্যজাত সন্তানকে। শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে কংসের হাত একটুও কাঁপেনি। এভাবে বসুদেব-দেবকীর আরও ছয়টি সন্তান একে একে কংসের নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার হন।
এদিকে গোকুলে বাস করতেন বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী। তার উদরে জন্ম নেয় আরেক পুত্রসন্তান। নাম তার বলরাম। একে একে দেবকীর সাতটি সন্তানকে হত্যার পর মৃত্যুর চিন্তায় উৎকন্ঠিত কংস তখন আরো দিশেহারা। এরপর দেবকী অষ্টম বারের মত সন্তানসম্ভবা হলে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কঠোর করা হয়।
অন্যদিকে সাতটি সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর কারারূদ্ধ দেবকী-বসুদেব দম্পতি। তারা কংসের হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বরের শরণাপন্ন হন। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের সেই যুগসন্ধিক্ষণে তারা শুরু করেন বিষ্ণুর বন্দনা। দেবতা বিষ্ণু এই সন্তান হারানোর শোকে কাতর মাতা-পিতার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেননি। ফলে ধরণীর অত্যাচারিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে এবং অরাজকতার দিনের অবসান করতে ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথির কৃষ্ণপক্ষের গভীর অন্ধকার রাতে চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত করে আর্বিভূত হন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ যুগ অবতার।
কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেই দেবকী কারাপ্রকোষ্ঠে অষ্টম সন্তানের জন্ম দিলেন। বসুদেব দেখতে পেলেন নবজাতক শিশুটি চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। সারা দেহে শোভা পাচ্ছে নানা রকম মহামূল্যের মনিমাণিক্য খচিত সব অলংকার। বসুদেব তিনি বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণই জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের ঘরে। মর্তের বুকে আবির্ভাব ঘটেছে শ্রীকৃষ্ণ মহাবতারের।
বসুদেব করজোড়া প্রণাম করে তার বন্দনা শুরু করলেন। সেই সময় বসুদেব ও দেবকী দৈববাণী শুনতে পান, ‘আমি জনি, আপনারা আমাকে নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত এবং কংসের ভয়ে ভীত। তাই আমাকে এখান থেকে গোকুলে নিয়ে চলুন। সেখানে নন্দ এবং যশোদার ঘরে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমাকে ওখানে রেখে তাকে এখানে নিয়ে আসুন।’
এ দৈববাণী শুনে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বসুদেব কারাগার থেকে বের হবার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না কারাগারে এত প্রহরীর উপস্থিতির মধ্যে তিনি কীভাবে নবজাতককে নিয়ে বের হবেন। আর এই ঘোর কৃষ্ণরাতের অন্ধকারে কোন পথেই বা যাবেন।
অন্যদিকে গোকুলে নন্দ এবং যশোদার সন্তানরূপে যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি আর কেউ নন। তিনি হলেন ভগবানের অন্তরঙ্গ শক্তি যোগমায়া। যোগমায়ার প্রভাবে কংসের প্রাসাদের প্রহরীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কারাগারের দরজা আপনা আপনি খুলে যায়। সে রাত ছিল ঘোর অন্ধকার। কিন্তু যখন বসুদেব তার শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে এলেন তখন সবকিছু দিনের আলোর মত দেখতে পেলেন। আর ঠিক সেই সময় গভীর বজ্রনিনাদের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। বসুদেব যখন শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন ভগবান শেষসর্পরূপ ধারণ করে বসুদেবের মাথার উপরে ফণা বিস্তার করলেন। বসুদেব যমুনা তীরে এসে দেখলেন যমুনা নদীর জল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে ছুটে চলেছে। কিন্তু এই ভয়ংকর রূপ সত্ত্বেও যমুনা বসুদেবকে যাবার পথ করে দিলেন।
এভাবে বসুদেব যমুনা পার হয়ে ও একে একে নানা বাধা অতিক্রম করে গোকুলে নন্দ মহারাজের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন সমস্ত গোপগোপীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। এই সুযোগে তিনি নিঃশব্দে যশোদার ঘরে প্রবেশ করে শ্রীকৃষ্ণকে সেখানে রেখে যশোদার সদ্যজাত শিশুকন্যাটিকে সঙ্গে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এলেন। দেবকীর কোলে শিশুকন্যাটিকে তুলে দিলেন বসুদেব। এভাবে বসুদেব নিজেকে আবারো শৃংখলিত করলেন, যাতে করে কংস বুঝতে না পারে রাতের অন্ধকারে কারাগারের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যে কী ঘটে গেছে। যদিও পরবর্তীতে কংস বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এদিকে মাতা যশোদার কোলে বড় হতে থাকে শ্রীকৃষ্ণ। এর মাঝে কংস নানাভাবে শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সব চক্রান্তই ব্যার্থ হয়ে যায়। কংসের অত্যাচারে নিপীড়িত মানুষ মুক্তির আশায় কানু তথা কৃষ্ণের অনুসারী হয়ে উঠে। ক্রমান্বয়ে ধরণীর নিপীড়িত মানুষেরা কংসবধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। কংসবধের জন্য মথুরায় আয়োজন করা হয় মল্লক্রীড়ার। এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় কৃষ্ণ ও বলরামকে। এ মল্লক্রীড়ায় উপস্থিত হন আশেপাশের রাজ্যের অন্যান্য রাজন্যবর্গও।
অন্যদিকে কৃষ্ণবধের অলীক আশায় কংস তখন আত্মহারা। ক্রীড়া প্রাঙ্গণের সামনে পাগলা হাতি রাখা হয় কৃষ্ণকে পিষে মারার জন্য। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কংস চানুর ও মুষ্টিক নামে দুই খ্যাতিমান ও অত্যন্ত বলবান মল্লবীরকে কৃষ্ণ হত্যার জন্য সেখানে উপস্থিত করেন। কিন্তু অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। কৃষ্ণের মুষ্ঠির আঘাতে নিহত হয় কংসের সেই হাতি, মুষ্ঠিক ও চানুর। হতভম্ব কংস উপস্থিত নিজ রাজন্যবর্গ, সেনদল ও সহচর সহ সবাইকে তার পক্ষে অস্ত্রধারণ করতে বলেন। কিন্তু কেউই সেই আবেদনে সাড়া দিলেন না। তখন নিরুপায় কংস যুদ্ধনীতি লঙ্ঘন করে অস্ত্র নিয়ে নিজেই শ্রীকৃষ্ণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে কৃষ্ণের লৌহ মুষ্ঠির আঘাতে কংসকে ভূমিতলে শয্যা নিতে হয়।
সমগ্র ভারতবর্ষে যখন হানাহানি, রক্তপাত, সংঘর্ষ, রাজ্যলোভে রাজন্যবর্গের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ তথা পৃথিবী যখন মর্মাহত, ঠিক সেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের যুগ সন্ধিক্ষণে তাঁর আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়ে।
ধর্মরাজ্য সংস্থাপন ও দুষ্কৃতদের বিনাশ – এই দুই উদ্দেশ্যেই তিনি দেহধারণ করেছিলেন। রাজনীতিজ্ঞ, যোদ্ধা, কর্তব্যপরায়ণ, ধর্মপ্রচারক ও মহাযোগী – এক কথায় কৃষ্ণ ছিলেন আদর্শ পুরুষ। পিতৃস্বসা (পিসীমাতা) কুন্তির তৃতীয় পুত্র অর্জুন (পূর্বজন্মে নর-ঋষি) ছিলেন কৃষ্ণের সখা। অর্থাৎ নরনারায়ণই কৃষ্ণার্জুন হিসেবে মর্ত্তে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সখাত্ব ছাড়াও অর্জুনের সঙ্গে কৃষ্ণের আরেকটি মধুর সম্পর্ক ছিল। অর্জুন কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় ভগিনী সুভদ্রাকে বিবাহ করেছিলেন। যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান বলে সন্মান করতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ শুরু করার আগে তিনি সব সময়ে কৃষ্ণের পরামর্শ নিয়েছেন । রাজসূয়-যজ্ঞের আগে জরসন্ধকে বধ, দুর্যোধনের কাছে অর্ধরাজ্য দাবী করে শান্তির দূত প্রেরণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সৈন্যাধ্যক্ষ নির্বাচন, মহাযোদ্ধাদের বধের উপায়, ইত্যাদি সর্ব ব্যাপারে কৃষ্ণের উপদেশের ওপরেই যুধিষ্ঠির নির্ভর করেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ কারোর পক্ষ নিয়েই যুদ্ধ করেন নি, কারণ কৌরব ও পাণ্ডব – উভয়ই ছিলেন ওঁর আত্মীয় – পাণ্ডবরা জন্মসূত্রে, কৌরবরা বৈবাহিক সূত্রে। দুর্যোধনের কন্যা লক্ষণার সঙ্গে কৃষ্ণের পুত্র শাম্বের বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের কল্যাণকেই তিনি জগতের কল্যাণ হিসেবে দেখেছেন। তাই যুদ্ধ না করেও পাণ্ডবদের যাতে জয় হয় সেটাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। কাম্যক বনে বনবাসের সময়ে দ্রৌপদী যখন সভাগৃহে দুর্যোধনদের হাতে তাঁর লাঞ্ছনার কথা কৃষ্ণকে জানিয়ে কৃষ্ণের শরণ নিয়েছেন, তখন দ্রৌপদীকে শোক করতে বারণ করে বলেছেন যে, পাণ্ডবদের যাতে কল্যাণ হয়, তাই তিনি করবেন। দ্রৌপদীকে রাজগণের রাণী করবেন বলেও প্রতিজ্ঞা করেছেন। রাজসূয় যজ্ঞের সময়ে মহামতি ভীষ্ম কৃষ্ণকে শ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসেবে সন্মান দিয়েছেন। কৃষ্ণের সত্য-পরিচয় ভীষ্ম বা বিদুরের অজ্ঞাত ছিল না। দুর্যোধন অন্যপক্ষে কৃষ্ণকে যদু বংশীয় বীর হিসেবেই দেখতেন। তাই কৃষ্ণ যখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য পাণ্ডবদের হয়ে দৌত্য করতে এলেন, তখন একেলা এসেছেন বলে তাঁকে বন্দী করবার দুর্মতিও দুর্যোধনের হয়েছিল। বিদুরের কাছে কৃষ্ণের ইন্দ্রকে পরাজিত করার কাহিনী, পূতনাবধ, গোবর্ধন-ধারণ, অরিষ্ট-ধেনুক-কংস- শিশুপাল প্রভৃতির নিধনের কথা শুনেও কৃষ্ণকে সম্যক রূপে তিনি চিনতে পারেন নি। কৃষ্ণ যে একা নন, সেটা দুর্যোধনকে বোঝানোর জন্য অট্টহাস্য করতেই কৃষ্ণের মুখের ভেতর থেকে আদিত্য রুদ্র বসুগণ বেরিয়ে এসে তাঁর দেহে অধিষ্ঠান করল, পাণ্ডগণ ও বৃষ্ণ্যন্ধকগণ তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালেন। তাঁর সেই ভয়ঙ্কর বিশ্বরূপ দেখে ভীষ্ম, দ্রোণ ও বিদুর ছাড়া আর সবাই ভয়ে চক্ষু মুদ্রিত করলেও দুর্যোধনের তাতে চেতনা হল না। দৌত্য বিফল হল। ফেরার পথে যে-কর্ণ দুর্যোধনের মস্ত বড় সহায় তাঁকে কৃষ্ণ ধরলেন। কৃষ্ণ কর্ণকে তাঁর জন্ম পরিচয় জানিয়ে পাণ্ডবদের দলে যোগ দিতে আহবান করলেন। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব হিসেবে সিংহাসন বসার এবং দ্রৌপদীকে ভার্যা হিসেবে পাবার অধিকার ওঁর থাকবে – সেই প্রলোভনও দেখালেন। কর্ণ রাজি হলেন না, যদিও এই যুদ্ধের ঘোর পরিণাম কৃষ্ণের কথায় তিনি বুঝতে পারলেন। যুদ্ধ না করলেও কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণই পাণ্ডবপক্ষকে চালনা করেছেন। যুদ্ধারম্ভে প্রতিপক্ষে ভীষ্ম, দ্রোণ ও অন্যান গুরুজন এবং বন্ধুবান্ধবদের দেখে অর্জুন যখন বিষাদগ্রস্থ হয়ে ধনুর্বান ত্যাগ করলেন,তখন কর্মযোগ জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগের তত্বাবলী শুনিয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে উদ্বুদ্ধ করলেন। অর্জুনকে বিশ্বরূপ প্রদর্শন করে – এই সমস্থ কিছুই যে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটছে, অর্জুন শুধু তার নিমিত্ত মাত্র – এই গভীর সত্য অর্জুনকে তিনি বুঝিয়েছেন। পাণ্ডবদের জয়ের জন্য তিনি এত উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, যুদ্ধের তৃতীয় দিনে ভীষ্ম যখন বিপুল বিক্রমে পাণ্ডব সৈন্য সংহার করছেন, তখন কৃষ্ণ তা সহ্য করতে না পেরে নিজের প্রতিজ্ঞা ভুলে রথ থেকে লাফিয়ে নেমে ভীষ্মকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে পেরেছেন দেখে ভীষ্মও পরম আনন্দিত হয়েছিলেন। অর্জুনের হস্তক্ষেপে কৃষ্ণ তাঁর সম্বিৎ ফিরে পান। অর্জুন যখন শপথ করেন যে, সূর্যাস্তের আগে জয়দ্রথকে বধ না করতে পারলে তিনি অগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন দেবেন, তখন সেই কার্যে অর্জুনকে সফল করতে যোগবলে সূর্যাস্তের একটু আগেই ক্ষণকালের জন্য সূর্যকে তিনি আচ্ছাদিত করেছেন। সূর্যাস্ত হয়েছে ভেবে জয়দ্রথের নিরপত্তা বেষ্টনী একটু শিথিল হতেই জয়দ্রথের সন্মুখীন হয়ে অর্জুন তাঁকে বধ করতে পেরেছেন। দিব্যাস্ত্র দিয়ে জয়দ্রথের শিরশ্ছেদ করে মুণ্ডুটিকে অনেক দূরে তাঁর পিতার কোলে না ফেললে যে অর্জুনের মস্তক শতধা বিদীর্ণ হবে – সে ব্যাপারে অর্জুনকে তিনি সাবধান করেছেন। কর্ণের কাছে যতদিন ইন্দ্রপ্রদত্ত একপুরুষ-ঘাতিনী অস্ত্র ছিল, কৃষ্ণ ততদিন অর্জুনকে নিয়ে কর্ণের সন্মুখীন হন নি। কর্ণ যখন সেই অস্ত্র প্রয়োগ করে ঘটোৎকচকে বধ করতে বাধ্য হলেন, তখন পুত্রহারা পাণ্ডবরা শোকাহত হলেও, কৃষ্ণকে পরিতুষ্ট হতে দেখা গেছে। তার প্রথম কারণ এবার কর্ণকে বধ করা অর্জুনের পক্ষে সম্ভব হবে। দ্বিতীয় কারণ, ভীমের পুত্র হিসেবে পাণ্ডবদের নানান ভাবে সহায়তা করলেও, রাক্ষসীর গর্ভজাত বলে ঘটোৎকচ স্বভাবতই ধর্মদ্বেষী পাপাত্মা। পাপাত্মাদের ধবংস করাই কৃষ্ণের কাজ। কৌরবদের পরাজিত করতে ছলনার আশ্রয় নিতেও কৃষ্ণের কোনও অসুবিধা হয় নি। দ্রোণ যখন অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করছেন, তখন কৃষ্ণই যুধিষ্ঠিরকে ছলনা করে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থমার নিধন বার্তা শোনাতে বলেন। এই কথা শুনলে দ্রোণ অবশ্যই অস্ত্রত্যাগ করবেন – তা তিনি জানতেন। ওঁর সখা অর্জুনও এই পরামর্শে সায় দিতে পারেন নি। তখন কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বুঝিয়েছেন যে, জীবন রক্ষার জন্য মিথ্যা বললে তাতে পাপ হয় না। পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনে অশ্বত্থমা যখন নারায়ণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন,তখন কৃষ্ণ সবাইকে শস্ত্রত্যাগ করে রথ থেকে নামতে বললেন। কৃষ্ণই শুধু জানতেন যে, এই ভাবেই এই অস্ত্রের হাত থেকে একমাত্র রক্ষা পাওয়া যায়। কর্ণের সঙ্গে অর্জুনের দ্বৈরথ যুদ্ধে অনেক্ষণ যুদ্ধের পর ব্রাহ্মণের প্রদত্ত শাপের জন্য কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ঢুকে গেল। চাকা তোলার জন্য কর্ণ অর্জুনের কাছে এক মুহূর্ত সময় চাইলেন। পাছে অর্জুন তাতে রাজি হয়ে যান, সেইজন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে বার বার মনে করিয়ে দিলেন দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা, সাত মহারথ মিলে অভিমন্যু বধ, জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার চক্রান্ত – এইসব কথা। কৃষ্ণের উদ্দেশ্য সাধিত হল। অর্জুন জ্বলে উঠে একটা মহাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। পরশুরামের অভিশাপে তাকে প্রতিহত করার কোনও দিব্যাস্ত্র কর্ণের স্মরণে এলো না। তাঁর মস্তক দেহচ্যূত হল। যুদ্ধের শেষে উরুভঙ্গ অবস্থায় মরণাহত দুর্যোধন কৃষ্ণকে কংসের দাসপুত্র বলে সম্বোধন করে, পাণ্ডবদের সমস্থ অন্যায় কর্ম যে কৃষ্ণের ষড়যন্ত্রেই সম্ভব হয়েছে জানিয়ে – স্বধর্মে নিরত কৌরবদের বধ করার জন্য কৃষ্ণকেই দায়ী করেছেন। কৃষ্ণ তাতে বিচলিত না হয়ে উত্তর দিয়েছেন যে, এগুলি সবই দুর্যোধনের দুষ্কার্যের প্রতিশোধ। তারপর বিষাদগ্রস্থ পাণ্ডবদের তিনি বলেছেন যে, শুধু ন্যায়ের পথ নিলে এই যুদ্ধজয় সম্ভব ছিল না বলেই যা করণীয় তা তিনি করতে বলেছেন। দুর্যোধন মরণাপন্ন, কিন্তু অশ্বত্থমা, কৃপ আর কৃতবর্মা বেঁচে আছেন। অশ্বত্থমা গভীর রাত্রে তাঁদের নিয়ে পাণ্ডবশিবিরে ঢুকে কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের অবর্তমানে দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র ও ধৃষ্টদ্যুম, শিখণ্ডী প্রমুখ পাঞ্চালগনকে হত্যা করে পাণ্ডবদের ভয়ে লুকিয়েছেন। পাণ্ডবরা এই দুঃসংবাদ শুনে যখন অশ্বত্থমার সন্মুখীন হলেন,তখন তিনি ভয়ঙ্কর অস্ত্র ব্রহ্মশির পাণ্ডবদের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করলেন। অর্জুন ব্রহ্মশিরকে সংহত করার জন্য নিজেও ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলেন। দুই দিব্যাস্ত্রে প্রায় অগ্নি-প্রলয়ের সৃষ্টি হল। দেবর্ষি নারদ ও ব্যাসদেবের নির্দেশে অর্জুন অস্ত্র সম্বরণ করলেন। অশ্বত্থমা বললেন যে, অস্ত্র প্রত্যাহার করা ওঁর পক্ষে অসাধ্য, সুতরাং তিনি অস্ত্রটি পাণ্ডবদের পুত্রবধূ উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানের ওপর নিক্ষেপ করবেন। কৃষ্ণ অশ্বত্থমাকে বললেন যে, অশ্বত্থমা তাতে সফল হবেন না। উত্তরার মৃত পুত্র ভূমিষ্ঠ হবার পর কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে বাঁচিয়ে তুলবেন। তারপর অশ্বত্থমাকে তিনি কুকর্মের জন্য অভিশাপ দিলেন যে, তিন হাজার বছর ব্যধিগ্রস্থ ও নিঃসঙ্গ হয়ে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হবে। কৃষ্ণের মহিমা আবার দেখা যায় যখন যুদ্ধের শেষে আগে অর্জুনকে তিনি রথ থেকে নামতে বললেন। অর্জুনের পর কৃষ্ণ নামতেই রথ ভস্মসাত্ হয়ে গেল। অর্জুনকে তখন কৃষ্ণ বললেন যে,দ্রোণ আর কর্ণের আগ্নেয়াস্ত্রে রথ আগেই দ±ধ হয়ে গিয়েছিল,কিন্তু কৃষ্ণ বসেছিলেন বলে তা ভস্ম হতে পারে নি। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে পুত্রশোকাতুর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে সান্ত্বনা দেবার জন্য পাণ্ডবদের সঙ্গে কৃষ্ণও গিয়েছিলেন। পুত্র-পৌত্রাদির অস্ত্রাঘাত-ছিন্ন মৃতদেহ দর্শনে আর বিধবা বধূদের করুণ বিলাপে গান্ধারী নিজেও স্থির রাখতে পারছিলেন না। কৃষ্ণকে বললেন যে, কৃষ্ণ অসীম ক্ষমতাধারী হয়েও, কেন কুরুকুলের এই ক্ষয় হতে দিলেন! তারপর কৃষ্ণকে অভিশাপ দিলেন যে, পঁয়ত্রিশ বছর পরে কৃষ্ণের জ্ঞাতিগণও পরস্পর হানাহানি করে নির্মূল হবে। কৃষ্ণ নিজেও সবাইকে হারিয়ে একা বনে বনে ভ্রমণ করে অবশেষে নিহত হবেন। কৃষ্ণ তার উত্তরে বলেছিলেন, এটা যে ঘটবে সেটা তাঁর অজানা নয়। যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ-যজ্ঞ শেষ হবার পর কৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে যাবার পর যাদবদের মধ্যে হানাহানি শুরু হল। কৃষ্ণ সবাইকে তীর্থযাত্রা করে সমুদ্রতীরে যাবার নির্দেশ দিলেন। প্রভাস-তীর্থে যাদবরা মদ্যপানে মত্ত হয়ে হানাহানি করে সবই নিহত হল। অর্জুনকে খবর পাঠিয়ে, অর্জুন না আসা পর্যন্ত পিতা বসুদেবের ওপরে যাদবনারীদের রক্ষার ভার দিয়ে, কৃষ্ণ বলরামের খোঁজে গেলেন। গিয়ে দেখলেন যোগযুক্ত অবস্থায় বলরাম দেহত্যাগ করছেন। বলরামের দেহত্যাগের পর কৃষ্ণ গভীর অরণ্যে বসে যোগালম্বন করলেন। বহুবছর আগে মহর্ষি দুর্বাসা তাঁর উচ্ছিষ্ট পায়েস কৃষ্ণকে সর্বাঙ্গে লেপন করতে আদেশ দিলে, কৃষ্ণ পদতল ব্যতীত সবস্থানেই তা লেপন করেছিলেন। তাই দেখে দুর্বাসা বলেছিলেন যে, পদতলে আহত হয়েই কৃষ্ণ দেহত্যাগ করবেন। গান্ধারী বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হবে যখন তিনি একাকি অরণ্যে থাকবেন। তাই সত্য হল। জরা নামে এক ব্যাধ হরিণ ভ্রমে কৃষ্ণের পদতলে বাণ নিক্ষেপ করলেন। সেই ব্যধ যখন অপরাধ বুঝতে পারলেন, তখন কৃষ্ণ উর্ধলোকে যাত্রা করছেন।
‘যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।
অভ্যূত্থানম ধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।’
জ্ঞানযোগ ৭/৮।
অর্থাৎ ‘হে ভরত, যখনি পৃথিবীতে অধর্ম বেড়ে যায় তখনই আমি অবর্তীণ হই, অবতীর্ণ হয়ে সাধুদের রক্ষা দুষ্টের বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপন করি।’
দ্বাপর যুগের শেষদিকে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার লক্ষ্যে মহাবতার রূপে মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব ঘটেছিল।
ঘোর অমানিশার অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করায় কৃষ্ণের গায়ের রং শ্যামল, অন্য অর্থে ধূসর, পীত বা কালো।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদগীতার উদগাতা ভাগবান শ্রীকৃষ্ণ অরাজকতায় আচ্ছন্ন পৃথিবীতে অবতরণ করে কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালসহ বিভিন্ন অত্যাচারিত রাজাদের বধ করেন। ধ্বংস করেন সকল অশুভ শক্তিকে। প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মরাজ্যের। আর এভাবেই শ্রীকৃষ্ণ অরাজকতার হাত থেকে কলুষমুক্ত করেন পৃথিবীকে। অরাজকতার স্থলে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।
গীতাতে স্বয়ং ভগবান ‘শ্রীকৃষ্ণ’ অর্জুনকে বলেছেন, ‘আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা, ¯্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।’
ভক্তরা তাঁকে যে নামে ডাকেন সেই নামেই তিনি সাড়া দেন। যেভাবে তাঁকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন। তাই তো তিনি দেবকী ও বসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাগারে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন পুত্ররূপে, ‘শ্রীকৃষ্ণ’ নামে।
মূলত ‘পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন’ই হলো শ্রীকৃষ্ণের বাণীর মূল বিষয়। তাই তো তিনি নিজ ভক্তদের কাছে হয়ে আছেন ‘প্রেমাবতার’।
ভগবানের একটি সরল সংজ্ঞা হচ্ছে : ‘জন্মাদাস্য য্তঃ’ – “যাঁর থেকে সমস্ত প্রকাশিত হয়” (ভা: 1/1/1)৷ ‘ভগবান’ শব্দটি সংস্কৃত, এবং এর অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি- “(১) সমগ্র ঐশ্বর্য (ধনসম্পদ), (২) সমগ্র বীর্য (শক্তিমত্তা), (৩) সমগ্র য্শ, (৪) সমগ্র শ্রী (সৌন্দর্য, রূপবত্তা), (৫) সমগ্র জ্ঞান ও (৬) সমগ্র বৈরাগ্য যাঁর মধ্যে পূর্ণ-রূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান ৷” ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ছয়টি ঐশ্বর্য (ষড়ৈশ্বর্য ) এবং ‘বান’ শব্দের অর্থ যুক্ত বা সমন্বিত৷ যেমন জ্ঞানবান অর্থ জ্ঞান-সমন্বিত, ধনবান শব্দের অর্থ ধন-সমন্বিত, তেমনি ভগবান শব্দের অর্থ যিনি সম্পূর্ণভাবে ৬টি ঐশ্বর্য সমন্বিত৷ ঐ সমস্ত ঐশ্বর্য অন্যকে আকর্ষণ করে- আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার এটিই রহস্য৷ কারও যে-পরিমাণে এই ঐশ্বর্য থাকে, তিনি ততটাই আকর্ষণীয় হন৷ এজগতে সকলেরই ঐসব ঐশ্বর্য কিছু কিছু পরিমাণে রয়েছে- কিন্তু কেউই সমগ্র ঐশ্বর্য-সম্পন্ন নয়৷ অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা অত্যন্ত ধনবান, খুব বলবান, খুব রূপবান, অত্যন্ত য্শস্বী, খুব জ্ঞানী এবং অত্যন্ত বৈরাগ্যবান, কিন্তু কেউই দাবী করতে পারে না যে তাঁর সমগ্র ধনৈশ্বর্য , সমগ্র বলবত্তা, সমগ্র সৌন্দর্য ইত্যাদি রয়েছে- একমাত্র ভগবানেরই এগুলি পূর্ণমাত্রায় রয়েছে৷ উপরোক্ত ছয়টি ঐশ্বর্য যাঁর পূর্ণ মাত্রায় আছে, তিনি নিশ্চয়ই ‘সর্বাকর্ষক’৷ সংস্কৃত ভাষায় সর্বাকর্ষক শব্দের সমতুল শব্দ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’৷
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিজেই শ্রী গীতাতে বলছেনঃ
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।৪/৯।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
তাই ভগবানের জন্ম ও কর্ম সম্পর্কে আমাদের তত্ত্বগত ভাবে জানা প্রয়োজন ।
সেটা দ্বাপর যুগের ঘটনা। মগধের অধিপতি জরাসন্ধ ছিলেন এক রাজ্যলোভী রাজা। তিনি ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। আর সেই ব্যর্থ রাজা জরাসন্ধ গ্লানিতে অস্থির-উন্মাদ হয়ে শেষে আশ্রয় নেন এক কুটকৌশলের। মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র অত্যাচারী কংসকে নিজ দলে ভিড়িয়ে তার নিজের দুই মেয়েকে কংসের সাথে বিবাহ দেন হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য।
কংসের সিংহাসন লাভের দুর্বিনীত আকাক্ষার ফলে জরাসন্ধের সাথে এই আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন হয়। ফলে জরাসন্ধ ও কংস দুজনেই অনেকাংশে বলশালী হয়ে উঠেন। অন্যদিকে তাদের এই উত্থানে মথুরাবাসী উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। কারণ মথুরাবাসী ছিল অত্যন্ত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী। বিশেষকরে যাদবরা তাদের চিরশত্রু জরাসন্ধের সঙ্গে কংসের এ আত্মীয়তার বন্ধনকে মনে মনে ধিক্কার জানান। মনেপ্রাণে তারা হয়ে ওঠেন আরো বিদ্রোহী।
এদিকে ক্ষমতালোভী কংস পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে মথুরার সিংহাসন দখল করেন। তখন আত্মীয়-স্বজন বিশেষকরে যাদবকূল বিদ্রোহী হয়ে উঠে। এ অবস্থায় তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ প্রশমনের কৌশল হিসেবে কংস যাদবকূলের শুর সেনের পুত্র, বিশ্বস্ত বন্ধু বসুদেবের সাথে নিজ বোন দেবকীর বিবাহ দেন। কিন্তু ক্রমে কংসের আশা দুরাশায় পরিণত হয়।
সদ্য পরিণীতা বোন দেবকীকে বসুদেবসহ রথে করে নিয়ে যাবার সময় কংস এই দৈববাণী শুনতে পান – ‘তোমার এই বোনের অষ্টম সন্তানই হবে তোমার মৃত্যুর কারণ।’ মৃত্যুর আশংকায় ভীত কংস সে সময়ই দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলে বসুদেব কংসকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, দেবকীর উদরে যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে তিনি কংসের হাতে তুলে দেবেন। এ কথায় আশ্বস্ত হয়ে কংস বোন দেবকীকে তখন হত্যা করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু বোন ও ভগ্নীপতিকে তক্ষুনি কারাগারে নিক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করেননি।
কৃষ্ণ ছিলেন বিষ্ণুর অবতার। স্বয়ং নারায়ণ দেবকীর গর্ভে নিজের কৃষ্ণ কেশ নিক্ষেপ করেছিলেন, সেখান থেকেই কৃষ্ণের (কেশব) জন্ম।
এর দশ মাস দশদিন পর দেবকী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।সঙ্গে সঙ্গে কংসের হাতে তুলে দেন বসুদেব তার সদ্যজাত সন্তানকে। শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে কংসের হাত একটুও কাঁপেনি। এভাবে বসুদেব-দেবকীর আরও ছয়টি সন্তান একে একে কংসের নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার হন।
এদিকে গোকুলে বাস করতেন বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী। তার উদরে জন্ম নেয় আরেক পুত্রসন্তান। নাম তার বলরাম। একে একে দেবকীর সাতটি সন্তানকে হত্যার পর মৃত্যুর চিন্তায় উৎকন্ঠিত কংস তখন আরো দিশেহারা। এরপর দেবকী অষ্টম বারের মত সন্তানসম্ভবা হলে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কঠোর করা হয়।
অন্যদিকে সাতটি সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর কারারূদ্ধ দেবকী-বসুদেব দম্পতি। তারা কংসের হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বরের শরণাপন্ন হন। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের সেই যুগসন্ধিক্ষণে তারা শুরু করেন বিষ্ণুর বন্দনা। দেবতা বিষ্ণু এই সন্তান হারানোর শোকে কাতর মাতা-পিতার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেননি। ফলে ধরণীর অত্যাচারিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে এবং অরাজকতার দিনের অবসান করতে ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথির কৃষ্ণপক্ষের গভীর অন্ধকার রাতে চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত করে আর্বিভূত হন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ যুগ অবতার।
কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেই দেবকী কারাপ্রকোষ্ঠে অষ্টম সন্তানের জন্ম দিলেন। বসুদেব দেখতে পেলেন নবজাতক শিশুটি চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। সারা দেহে শোভা পাচ্ছে নানা রকম মহামূল্যের মনিমাণিক্য খচিত সব অলংকার। বসুদেব তিনি বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণই জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের ঘরে। মর্তের বুকে আবির্ভাব ঘটেছে শ্রীকৃষ্ণ মহাবতারের।
বসুদেব করজোড়া প্রণাম করে তার বন্দনা শুরু করলেন। সেই সময় বসুদেব ও দেবকী দৈববাণী শুনতে পান, ‘আমি জনি, আপনারা আমাকে নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত এবং কংসের ভয়ে ভীত। তাই আমাকে এখান থেকে গোকুলে নিয়ে চলুন। সেখানে নন্দ এবং যশোদার ঘরে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমাকে ওখানে রেখে তাকে এখানে নিয়ে আসুন।’
এ দৈববাণী শুনে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বসুদেব কারাগার থেকে বের হবার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না কারাগারে এত প্রহরীর উপস্থিতির মধ্যে তিনি কীভাবে নবজাতককে নিয়ে বের হবেন। আর এই ঘোর কৃষ্ণরাতের অন্ধকারে কোন পথেই বা যাবেন।
অন্যদিকে গোকুলে নন্দ এবং যশোদার সন্তানরূপে যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি আর কেউ নন। তিনি হলেন ভগবানের অন্তরঙ্গ শক্তি যোগমায়া। যোগমায়ার প্রভাবে কংসের প্রাসাদের প্রহরীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কারাগারের দরজা আপনা আপনি খুলে যায়। সে রাত ছিল ঘোর অন্ধকার। কিন্তু যখন বসুদেব তার শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে এলেন তখন সবকিছু দিনের আলোর মত দেখতে পেলেন। আর ঠিক সেই সময় গভীর বজ্রনিনাদের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। বসুদেব যখন শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন ভগবান শেষসর্পরূপ ধারণ করে বসুদেবের মাথার উপরে ফণা বিস্তার করলেন। বসুদেব যমুনা তীরে এসে দেখলেন যমুনা নদীর জল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে ছুটে চলেছে। কিন্তু এই ভয়ংকর রূপ সত্ত্বেও যমুনা বসুদেবকে যাবার পথ করে দিলেন।
এভাবে বসুদেব যমুনা পার হয়ে ও একে একে নানা বাধা অতিক্রম করে গোকুলে নন্দ মহারাজের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন সমস্ত গোপগোপীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। এই সুযোগে তিনি নিঃশব্দে যশোদার ঘরে প্রবেশ করে শ্রীকৃষ্ণকে সেখানে রেখে যশোদার সদ্যজাত শিশুকন্যাটিকে সঙ্গে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এলেন। দেবকীর কোলে শিশুকন্যাটিকে তুলে দিলেন বসুদেব। এভাবে বসুদেব নিজেকে আবারো শৃংখলিত করলেন, যাতে করে কংস বুঝতে না পারে রাতের অন্ধকারে কারাগারের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যে কী ঘটে গেছে। যদিও পরবর্তীতে কংস বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এদিকে মাতা যশোদার কোলে বড় হতে থাকে শ্রীকৃষ্ণ। এর মাঝে কংস নানাভাবে শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সব চক্রান্তই ব্যার্থ হয়ে যায়। কংসের অত্যাচারে নিপীড়িত মানুষ মুক্তির আশায় কানু তথা কৃষ্ণের অনুসারী হয়ে উঠে। ক্রমান্বয়ে ধরণীর নিপীড়িত মানুষেরা কংসবধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। কংসবধের জন্য মথুরায় আয়োজন করা হয় মল্লক্রীড়ার। এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় কৃষ্ণ ও বলরামকে। এ মল্লক্রীড়ায় উপস্থিত হন আশেপাশের রাজ্যের অন্যান্য রাজন্যবর্গও।
অন্যদিকে কৃষ্ণবধের অলীক আশায় কংস তখন আত্মহারা। ক্রীড়া প্রাঙ্গণের সামনে পাগলা হাতি রাখা হয় কৃষ্ণকে পিষে মারার জন্য। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কংস চানুর ও মুষ্টিক নামে দুই খ্যাতিমান ও অত্যন্ত বলবান মল্লবীরকে কৃষ্ণ হত্যার জন্য সেখানে উপস্থিত করেন। কিন্তু অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। কৃষ্ণের মুষ্ঠির আঘাতে নিহত হয় কংসের সেই হাতি, মুষ্ঠিক ও চানুর। হতভম্ব কংস উপস্থিত নিজ রাজন্যবর্গ, সেনদল ও সহচর সহ সবাইকে তার পক্ষে অস্ত্রধারণ করতে বলেন। কিন্তু কেউই সেই আবেদনে সাড়া দিলেন না। তখন নিরুপায় কংস যুদ্ধনীতি লঙ্ঘন করে অস্ত্র নিয়ে নিজেই শ্রীকৃষ্ণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে কৃষ্ণের লৌহ মুষ্ঠির আঘাতে কংসকে ভূমিতলে শয্যা নিতে হয়।
সমগ্র ভারতবর্ষে যখন হানাহানি, রক্তপাত, সংঘর্ষ, রাজ্যলোভে রাজন্যবর্গের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ তথা পৃথিবী যখন মর্মাহত, ঠিক সেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের যুগ সন্ধিক্ষণে তাঁর আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়ে।
ধর্মরাজ্য সংস্থাপন ও দুষ্কৃতদের বিনাশ – এই দুই উদ্দেশ্যেই তিনি দেহধারণ করেছিলেন। রাজনীতিজ্ঞ, যোদ্ধা, কর্তব্যপরায়ণ, ধর্মপ্রচারক ও মহাযোগী – এক কথায় কৃষ্ণ ছিলেন আদর্শ পুরুষ। পিতৃস্বসা (পিসীমাতা) কুন্তির তৃতীয় পুত্র অর্জুন (পূর্বজন্মে নর-ঋষি) ছিলেন কৃষ্ণের সখা। অর্থাৎ নরনারায়ণই কৃষ্ণার্জুন হিসেবে মর্ত্তে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সখাত্ব ছাড়াও অর্জুনের সঙ্গে কৃষ্ণের আরেকটি মধুর সম্পর্ক ছিল। অর্জুন কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় ভগিনী সুভদ্রাকে বিবাহ করেছিলেন। যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান বলে সন্মান করতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ শুরু করার আগে তিনি সব সময়ে কৃষ্ণের পরামর্শ নিয়েছেন । রাজসূয়-যজ্ঞের আগে জরসন্ধকে বধ, দুর্যোধনের কাছে অর্ধরাজ্য দাবী করে শান্তির দূত প্রেরণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সৈন্যাধ্যক্ষ নির্বাচন, মহাযোদ্ধাদের বধের উপায়, ইত্যাদি সর্ব ব্যাপারে কৃষ্ণের উপদেশের ওপরেই যুধিষ্ঠির নির্ভর করেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ কারোর পক্ষ নিয়েই যুদ্ধ করেন নি, কারণ কৌরব ও পাণ্ডব – উভয়ই ছিলেন ওঁর আত্মীয় – পাণ্ডবরা জন্মসূত্রে, কৌরবরা বৈবাহিক সূত্রে। দুর্যোধনের কন্যা লক্ষণার সঙ্গে কৃষ্ণের পুত্র শাম্বের বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের কল্যাণকেই তিনি জগতের কল্যাণ হিসেবে দেখেছেন। তাই যুদ্ধ না করেও পাণ্ডবদের যাতে জয় হয় সেটাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। কাম্যক বনে বনবাসের সময়ে দ্রৌপদী যখন সভাগৃহে দুর্যোধনদের হাতে তাঁর লাঞ্ছনার কথা কৃষ্ণকে জানিয়ে কৃষ্ণের শরণ নিয়েছেন, তখন দ্রৌপদীকে শোক করতে বারণ করে বলেছেন যে, পাণ্ডবদের যাতে কল্যাণ হয়, তাই তিনি করবেন। দ্রৌপদীকে রাজগণের রাণী করবেন বলেও প্রতিজ্ঞা করেছেন। রাজসূয় যজ্ঞের সময়ে মহামতি ভীষ্ম কৃষ্ণকে শ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসেবে সন্মান দিয়েছেন। কৃষ্ণের সত্য-পরিচয় ভীষ্ম বা বিদুরের অজ্ঞাত ছিল না। দুর্যোধন অন্যপক্ষে কৃষ্ণকে যদু বংশীয় বীর হিসেবেই দেখতেন। তাই কৃষ্ণ যখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য পাণ্ডবদের হয়ে দৌত্য করতে এলেন, তখন একেলা এসেছেন বলে তাঁকে বন্দী করবার দুর্মতিও দুর্যোধনের হয়েছিল। বিদুরের কাছে কৃষ্ণের ইন্দ্রকে পরাজিত করার কাহিনী, পূতনাবধ, গোবর্ধন-ধারণ, অরিষ্ট-ধেনুক-কংস- শিশুপাল প্রভৃতির নিধনের কথা শুনেও কৃষ্ণকে সম্যক রূপে তিনি চিনতে পারেন নি। কৃষ্ণ যে একা নন, সেটা দুর্যোধনকে বোঝানোর জন্য অট্টহাস্য করতেই কৃষ্ণের মুখের ভেতর থেকে আদিত্য রুদ্র বসুগণ বেরিয়ে এসে তাঁর দেহে অধিষ্ঠান করল, পাণ্ডগণ ও বৃষ্ণ্যন্ধকগণ তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালেন। তাঁর সেই ভয়ঙ্কর বিশ্বরূপ দেখে ভীষ্ম, দ্রোণ ও বিদুর ছাড়া আর সবাই ভয়ে চক্ষু মুদ্রিত করলেও দুর্যোধনের তাতে চেতনা হল না। দৌত্য বিফল হল। ফেরার পথে যে-কর্ণ দুর্যোধনের মস্ত বড় সহায় তাঁকে কৃষ্ণ ধরলেন। কৃষ্ণ কর্ণকে তাঁর জন্ম পরিচয় জানিয়ে পাণ্ডবদের দলে যোগ দিতে আহবান করলেন। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব হিসেবে সিংহাসন বসার এবং দ্রৌপদীকে ভার্যা হিসেবে পাবার অধিকার ওঁর থাকবে – সেই প্রলোভনও দেখালেন। কর্ণ রাজি হলেন না, যদিও এই যুদ্ধের ঘোর পরিণাম কৃষ্ণের কথায় তিনি বুঝতে পারলেন। যুদ্ধ না করলেও কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণই পাণ্ডবপক্ষকে চালনা করেছেন। যুদ্ধারম্ভে প্রতিপক্ষে ভীষ্ম, দ্রোণ ও অন্যান গুরুজন এবং বন্ধুবান্ধবদের দেখে অর্জুন যখন বিষাদগ্রস্থ হয়ে ধনুর্বান ত্যাগ করলেন,তখন কর্মযোগ জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগের তত্বাবলী শুনিয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে উদ্বুদ্ধ করলেন। অর্জুনকে বিশ্বরূপ প্রদর্শন করে – এই সমস্থ কিছুই যে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটছে, অর্জুন শুধু তার নিমিত্ত মাত্র – এই গভীর সত্য অর্জুনকে তিনি বুঝিয়েছেন। পাণ্ডবদের জয়ের জন্য তিনি এত উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, যুদ্ধের তৃতীয় দিনে ভীষ্ম যখন বিপুল বিক্রমে পাণ্ডব সৈন্য সংহার করছেন, তখন কৃষ্ণ তা সহ্য করতে না পেরে নিজের প্রতিজ্ঞা ভুলে রথ থেকে লাফিয়ে নেমে ভীষ্মকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে পেরেছেন দেখে ভীষ্মও পরম আনন্দিত হয়েছিলেন। অর্জুনের হস্তক্ষেপে কৃষ্ণ তাঁর সম্বিৎ ফিরে পান। অর্জুন যখন শপথ করেন যে, সূর্যাস্তের আগে জয়দ্রথকে বধ না করতে পারলে তিনি অগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন দেবেন, তখন সেই কার্যে অর্জুনকে সফল করতে যোগবলে সূর্যাস্তের একটু আগেই ক্ষণকালের জন্য সূর্যকে তিনি আচ্ছাদিত করেছেন। সূর্যাস্ত হয়েছে ভেবে জয়দ্রথের নিরপত্তা বেষ্টনী একটু শিথিল হতেই জয়দ্রথের সন্মুখীন হয়ে অর্জুন তাঁকে বধ করতে পেরেছেন। দিব্যাস্ত্র দিয়ে জয়দ্রথের শিরশ্ছেদ করে মুণ্ডুটিকে অনেক দূরে তাঁর পিতার কোলে না ফেললে যে অর্জুনের মস্তক শতধা বিদীর্ণ হবে – সে ব্যাপারে অর্জুনকে তিনি সাবধান করেছেন। কর্ণের কাছে যতদিন ইন্দ্রপ্রদত্ত একপুরুষ-ঘাতিনী অস্ত্র ছিল, কৃষ্ণ ততদিন অর্জুনকে নিয়ে কর্ণের সন্মুখীন হন নি। কর্ণ যখন সেই অস্ত্র প্রয়োগ করে ঘটোৎকচকে বধ করতে বাধ্য হলেন, তখন পুত্রহারা পাণ্ডবরা শোকাহত হলেও, কৃষ্ণকে পরিতুষ্ট হতে দেখা গেছে। তার প্রথম কারণ এবার কর্ণকে বধ করা অর্জুনের পক্ষে সম্ভব হবে। দ্বিতীয় কারণ, ভীমের পুত্র হিসেবে পাণ্ডবদের নানান ভাবে সহায়তা করলেও, রাক্ষসীর গর্ভজাত বলে ঘটোৎকচ স্বভাবতই ধর্মদ্বেষী পাপাত্মা। পাপাত্মাদের ধবংস করাই কৃষ্ণের কাজ। কৌরবদের পরাজিত করতে ছলনার আশ্রয় নিতেও কৃষ্ণের কোনও অসুবিধা হয় নি। দ্রোণ যখন অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করছেন, তখন কৃষ্ণই যুধিষ্ঠিরকে ছলনা করে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থমার নিধন বার্তা শোনাতে বলেন। এই কথা শুনলে দ্রোণ অবশ্যই অস্ত্রত্যাগ করবেন – তা তিনি জানতেন। ওঁর সখা অর্জুনও এই পরামর্শে সায় দিতে পারেন নি। তখন কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বুঝিয়েছেন যে, জীবন রক্ষার জন্য মিথ্যা বললে তাতে পাপ হয় না। পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনে অশ্বত্থমা যখন নারায়ণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন,তখন কৃষ্ণ সবাইকে শস্ত্রত্যাগ করে রথ থেকে নামতে বললেন। কৃষ্ণই শুধু জানতেন যে, এই ভাবেই এই অস্ত্রের হাত থেকে একমাত্র রক্ষা পাওয়া যায়। কর্ণের সঙ্গে অর্জুনের দ্বৈরথ যুদ্ধে অনেক্ষণ যুদ্ধের পর ব্রাহ্মণের প্রদত্ত শাপের জন্য কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ঢুকে গেল। চাকা তোলার জন্য কর্ণ অর্জুনের কাছে এক মুহূর্ত সময় চাইলেন। পাছে অর্জুন তাতে রাজি হয়ে যান, সেইজন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে বার বার মনে করিয়ে দিলেন দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা, সাত মহারথ মিলে অভিমন্যু বধ, জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার চক্রান্ত – এইসব কথা। কৃষ্ণের উদ্দেশ্য সাধিত হল। অর্জুন জ্বলে উঠে একটা মহাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। পরশুরামের অভিশাপে তাকে প্রতিহত করার কোনও দিব্যাস্ত্র কর্ণের স্মরণে এলো না। তাঁর মস্তক দেহচ্যূত হল। যুদ্ধের শেষে উরুভঙ্গ অবস্থায় মরণাহত দুর্যোধন কৃষ্ণকে কংসের দাসপুত্র বলে সম্বোধন করে, পাণ্ডবদের সমস্থ অন্যায় কর্ম যে কৃষ্ণের ষড়যন্ত্রেই সম্ভব হয়েছে জানিয়ে – স্বধর্মে নিরত কৌরবদের বধ করার জন্য কৃষ্ণকেই দায়ী করেছেন। কৃষ্ণ তাতে বিচলিত না হয়ে উত্তর দিয়েছেন যে, এগুলি সবই দুর্যোধনের দুষ্কার্যের প্রতিশোধ। তারপর বিষাদগ্রস্থ পাণ্ডবদের তিনি বলেছেন যে, শুধু ন্যায়ের পথ নিলে এই যুদ্ধজয় সম্ভব ছিল না বলেই যা করণীয় তা তিনি করতে বলেছেন। দুর্যোধন মরণাপন্ন, কিন্তু অশ্বত্থমা, কৃপ আর কৃতবর্মা বেঁচে আছেন। অশ্বত্থমা গভীর রাত্রে তাঁদের নিয়ে পাণ্ডবশিবিরে ঢুকে কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের অবর্তমানে দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র ও ধৃষ্টদ্যুম, শিখণ্ডী প্রমুখ পাঞ্চালগনকে হত্যা করে পাণ্ডবদের ভয়ে লুকিয়েছেন। পাণ্ডবরা এই দুঃসংবাদ শুনে যখন অশ্বত্থমার সন্মুখীন হলেন,তখন তিনি ভয়ঙ্কর অস্ত্র ব্রহ্মশির পাণ্ডবদের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করলেন। অর্জুন ব্রহ্মশিরকে সংহত করার জন্য নিজেও ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলেন। দুই দিব্যাস্ত্রে প্রায় অগ্নি-প্রলয়ের সৃষ্টি হল। দেবর্ষি নারদ ও ব্যাসদেবের নির্দেশে অর্জুন অস্ত্র সম্বরণ করলেন। অশ্বত্থমা বললেন যে, অস্ত্র প্রত্যাহার করা ওঁর পক্ষে অসাধ্য, সুতরাং তিনি অস্ত্রটি পাণ্ডবদের পুত্রবধূ উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানের ওপর নিক্ষেপ করবেন। কৃষ্ণ অশ্বত্থমাকে বললেন যে, অশ্বত্থমা তাতে সফল হবেন না। উত্তরার মৃত পুত্র ভূমিষ্ঠ হবার পর কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে বাঁচিয়ে তুলবেন। তারপর অশ্বত্থমাকে তিনি কুকর্মের জন্য অভিশাপ দিলেন যে, তিন হাজার বছর ব্যধিগ্রস্থ ও নিঃসঙ্গ হয়ে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হবে। কৃষ্ণের মহিমা আবার দেখা যায় যখন যুদ্ধের শেষে আগে অর্জুনকে তিনি রথ থেকে নামতে বললেন। অর্জুনের পর কৃষ্ণ নামতেই রথ ভস্মসাত্ হয়ে গেল। অর্জুনকে তখন কৃষ্ণ বললেন যে,দ্রোণ আর কর্ণের আগ্নেয়াস্ত্রে রথ আগেই দ±ধ হয়ে গিয়েছিল,কিন্তু কৃষ্ণ বসেছিলেন বলে তা ভস্ম হতে পারে নি। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে পুত্রশোকাতুর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে সান্ত্বনা দেবার জন্য পাণ্ডবদের সঙ্গে কৃষ্ণও গিয়েছিলেন। পুত্র-পৌত্রাদির অস্ত্রাঘাত-ছিন্ন মৃতদেহ দর্শনে আর বিধবা বধূদের করুণ বিলাপে গান্ধারী নিজেও স্থির রাখতে পারছিলেন না। কৃষ্ণকে বললেন যে, কৃষ্ণ অসীম ক্ষমতাধারী হয়েও, কেন কুরুকুলের এই ক্ষয় হতে দিলেন! তারপর কৃষ্ণকে অভিশাপ দিলেন যে, পঁয়ত্রিশ বছর পরে কৃষ্ণের জ্ঞাতিগণও পরস্পর হানাহানি করে নির্মূল হবে। কৃষ্ণ নিজেও সবাইকে হারিয়ে একা বনে বনে ভ্রমণ করে অবশেষে নিহত হবেন। কৃষ্ণ তার উত্তরে বলেছিলেন, এটা যে ঘটবে সেটা তাঁর অজানা নয়। যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ-যজ্ঞ শেষ হবার পর কৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে যাবার পর যাদবদের মধ্যে হানাহানি শুরু হল। কৃষ্ণ সবাইকে তীর্থযাত্রা করে সমুদ্রতীরে যাবার নির্দেশ দিলেন। প্রভাস-তীর্থে যাদবরা মদ্যপানে মত্ত হয়ে হানাহানি করে সবই নিহত হল। অর্জুনকে খবর পাঠিয়ে, অর্জুন না আসা পর্যন্ত পিতা বসুদেবের ওপরে যাদবনারীদের রক্ষার ভার দিয়ে, কৃষ্ণ বলরামের খোঁজে গেলেন। গিয়ে দেখলেন যোগযুক্ত অবস্থায় বলরাম দেহত্যাগ করছেন। বলরামের দেহত্যাগের পর কৃষ্ণ গভীর অরণ্যে বসে যোগালম্বন করলেন। বহুবছর আগে মহর্ষি দুর্বাসা তাঁর উচ্ছিষ্ট পায়েস কৃষ্ণকে সর্বাঙ্গে লেপন করতে আদেশ দিলে, কৃষ্ণ পদতল ব্যতীত সবস্থানেই তা লেপন করেছিলেন। তাই দেখে দুর্বাসা বলেছিলেন যে, পদতলে আহত হয়েই কৃষ্ণ দেহত্যাগ করবেন। গান্ধারী বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হবে যখন তিনি একাকি অরণ্যে থাকবেন। তাই সত্য হল। জরা নামে এক ব্যাধ হরিণ ভ্রমে কৃষ্ণের পদতলে বাণ নিক্ষেপ করলেন। সেই ব্যধ যখন অপরাধ বুঝতে পারলেন, তখন কৃষ্ণ উর্ধলোকে যাত্রা করছেন।
‘যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।
অভ্যূত্থানম ধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।’
জ্ঞানযোগ ৭/৮।
অর্থাৎ ‘হে ভরত, যখনি পৃথিবীতে অধর্ম বেড়ে যায় তখনই আমি অবর্তীণ হই, অবতীর্ণ হয়ে সাধুদের রক্ষা দুষ্টের বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপন করি।’
দ্বাপর যুগের শেষদিকে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার লক্ষ্যে মহাবতার রূপে মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব ঘটেছিল।
ঘোর অমানিশার অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করায় কৃষ্ণের গায়ের রং শ্যামল, অন্য অর্থে ধূসর, পীত বা কালো।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদগীতার উদগাতা ভাগবান শ্রীকৃষ্ণ অরাজকতায় আচ্ছন্ন পৃথিবীতে অবতরণ করে কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালসহ বিভিন্ন অত্যাচারিত রাজাদের বধ করেন। ধ্বংস করেন সকল অশুভ শক্তিকে। প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মরাজ্যের। আর এভাবেই শ্রীকৃষ্ণ অরাজকতার হাত থেকে কলুষমুক্ত করেন পৃথিবীকে। অরাজকতার স্থলে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।
গীতাতে স্বয়ং ভগবান ‘শ্রীকৃষ্ণ’ অর্জুনকে বলেছেন, ‘আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা, ¯্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।’
ভক্তরা তাঁকে যে নামে ডাকেন সেই নামেই তিনি সাড়া দেন। যেভাবে তাঁকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন। তাই তো তিনি দেবকী ও বসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাগারে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন পুত্ররূপে, ‘শ্রীকৃষ্ণ’ নামে।
মূলত ‘পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন’ই হলো শ্রীকৃষ্ণের বাণীর মূল বিষয়। তাই তো তিনি নিজ ভক্তদের কাছে হয়ে আছেন ‘প্রেমাবতার’।

Comments
Post a Comment