বৈকুন্ঠ/বিষ্ণুলোক/পরমধাম/বিষ্ণুধাম
বৈকুন্ঠ/বিষ্ণুলোক/পরমধাম/বিষ্ণুধাম
=====================
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর -
আমি চির উন্নত শির!
এই অনন্তকোটি জড় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা , শ্রীব্রহ্মসংহিতায় বর্ণনা করেছেন -
"এই দেবীধাম, তার উপরে মহেশধাম, তার উপরে হরিধাম বা বৈকুণ্ঠ এবং সবার উপরে এই গোলোক নামক নিজধাম অর্থাৎ স্বয়ং ভগবানের পরম ধাম এবং এই সকল প্রকার, সেই সেই ধামে সেই সেই প্রভাব যিনি বিধান করছেন সেই পরমেশ্বর ভগবান আদিপুরুষ শ্রীগোবিন্দকে আমি ভজনা করি"
সৃষ্টিকর্তার সিংহাসন হচ্ছে ইব্রাহিমীয় ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মে বর্ণিত পরম প্রভুর অবস্থানস্থল। মুসলমানগণ এটাকে বলে আল্লাহর আরশ (আরবিতে আল-আরশ), খ্রিস্টানদের কাছে থ্রোন অব গড (throne of God) বা ঈশ্বরের সিংহাসন এবং ইহুদিদের কাছে আরাবত নামে পরিচিত। পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহে ঈশ্বরের সিংহাসনের কথা বলা হয়েছে। ইব্রাহিমীয় ধর্মমতানুসারে, এটি সপ্তম স্বর্গের উপরে অবস্থিত।
ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরাণ এর সুরা ইউনুস – ১০,৩
নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ শ্রী গীতায় ১৮ তম অধ্যায়ের ৬৬ তম শ্লোকে বলছেন
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।৬৬।।
অনুবাদঃ সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।
সনাতন ধর্মে বৈষ্ণববাদ অনুযায়ীঃ বৈকুন্ঠ কিন্তু স্বর্গ বা নরক নয় । এ এমন এক জায়গা যেখানে অবস্থান করেন ভগবান বিষ্ণু । যেখানে একবার জীব প্রবেশ করলে আর এই পৃথিবীতে আসতে হয় না । সেখানে সে মুক্ত । সেখানে শুধু সুখ আর সুখ , অনন্ত সুখ ।
ভাগবত পুরাণে নারায়ণকে বলা হয়েছে সর্বোচ্চ উপাস্য। এই পুরাণ মতে, তিনি অসংখ্য জগৎ সৃষ্টি করে প্রতিটি জগতে জগদীশ্বর রূপে প্রবেশ করেছেন। ব্রহ্মা রূপে রজঃ গুণ অবলম্বন করে তিনি চোদ্দটি জগৎ সৃষ্টি করেছেন। বিষ্ণু রূপে সত্ত্ব গুণ অবলম্বন করে তিনি সেগুলি রক্ষা করেন এবং শিব রূপে তমঃ গুণ অবলম্বন করে তিনি তা ধ্বংস করেন।
নারায়ণের অপর নাম "মুকুন্দ"। এই শব্দের অর্থ, যিনি জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি অর্থাৎ মোক্ষ প্রদান করেন।
জাগতিক বিশ্বের বাইরে নারায়ণের সর্বোচ্চ ও চিরন্তন অধিষ্ঠান বৈকুণ্ঠে। বৈকুণ্ঠকে হিন্দুরা আনন্দময় স্থান মনে করেন। বৈকুণ্ঠ পরমধামও (অর্থাৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান যেখানে মুক্তাত্মারা পরমেশ্বেরের সান্নিধ্যে চিরকালের জন্য বাস করেন) বলা হয়। হিন্দুরা মনে করেন, বৈকুণ্ঠের ধারণা কোনো জাগতিক বিজ্ঞান বা যুক্তির সাহায্যে করা যায় না কোনো কোনো ক্ষেত্রে, ক্ষীরসমুদ্র, যেখানে বিষ্ণু অনন্তনাগের উপর শয়ন করেন, তাকে জাগতিক বিশ্বের "স্থানীয় বৈকুণ্ঠ" বলা হয়।
শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বরভগবান,পরমব্রহ্ম। শ্রীকৃষ্ণই সকল সত্তার উৎস। শ্রীকৃষ্ণই আদি, মধ্য এবং অন্ত্য । শ্রীকৃষ্ণই অজাত, অজম।সর্বকারনের পরম কারণ ।শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণ-পুর্নম।
চিৎ জগতের গোলক বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বিরাজমান। গোলক বৃন্দাবন বেষ্টনকারী অন্তহীন চিৎজগতের বৈকুন্ঠধামে শ্রীকৃষ্ণ চতুর্ভুজরূপী নারায়ন রূপে বিরাজমান। শ্রীকৃষ্ণ মহাবিষ্ণুরূপে নিজেকে বিস্তার করেন এবং এই সীমাবদ্ধ জড়ো বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেন। শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবেশ করেন এবং সেগুলিকে পরিচালনা করেন।শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি জীবসত্তা ,জড়বস্তু , সক্রিয় কিংবা নিস্ক্রিয় শরীরে ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবেশ করেন এবং তাদের প্রতিপালন করেন।
বৈকুন্ঠকে কৃষ্ণ ধামও বলা হয়ে থাকে ।
"সেই ধামে চিন্ময় রত্নসমূহের দ্বারা বিরোচিত প্রাসাদ রয়েছে। কোনও জড় বস্তু দিয়ে সেই জগৎ গঠিত নয়। সেখানে কল্পবৃক্ষ রয়েছে। এই জগতে যদি কখন কোন কল্প বৃক্ষ থাকে, তবে তার কাছে ধর্ম,অর্থ,কাম ও মোক্ষরুপ ফল পাওয়া যেতে পারে ; কিন্তু কৃষ্ণলোকে কল্পবৃক্ষ প্রেমভক্তির নান বৈচিত্ররুপ অনন্ত ফল দিয়ে থাকে। সেই লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষ পরিবেষ্টিত দিব্য রত্নময় আলয়সমুহ সেখানে বিদ্যমান। সেই আলয় সমুহে সুরভী গাভীসকল পালিত হচ্ছে। সাধারণ কামধেনু দোহন করা মাত্রই দুধ দেয়, আর গোলকের কামধেনু সমুহ ভক্তদের কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করে তাই নয়,সেই কাম ধেনু সকল চিন্ম পরমানন্দ ধারায় প্রেমের স্রোত বইয়ে অনগ'ল দুগ্ধামৃতের মহাসমুদ্র সৃষ্টি করে। শতসহস্র গোপিসুন্দরী-লক্ষীগণ পরম যত্ন সহকারে সেখানে শ্রী কৃষ্ণের সেবা করছেন।" সেই ধামে মানুষ যেতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ-প্রতিনিধি সদ্ গুরুর কৃপায় শুদ্ধ ভক্তিপূন' কৃষ্ণভাবনাময় স্বীয় চিদবৃত্তিকে অবলম্বন করে সেই গোলক ধামে উপনীত হওয়া যায়। জড়জাগতিক কামনাবাসনাময় নেত্রে নয়, প্রেম নেত্রেই ভগবান কে দেখা যায়। "ভগবৎ প্রেমের রঞ্জনে রঞ্জিত ভক্তিনেত্রে নিষ্টাবান সাধুগণ সর্বদা তাঁদের হৃদয়ে সেই অচিন্ত্যগুণবিশিষ্ট পরমসুন্দর শ্যামসুন্দরকে দর্শন করেন।
আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির মাধ্যমে নিজেই এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে সেই গোলোকধামের বর্ণনা প্রদান করে গেছেন।যা তিনি বহু পূর্বে সূর্যদেবকে দান
করেছিলেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশ দিয়েছেন, সেই অব্যক্ত অক্ষয় চিন্তামণি ধামই সমস্ত জীবের পরম গতি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নিষ্ঠাভক্তির মাধ্যমে কোনদিন যদি কেউ সেখানে যেতে পারেন তবে আর কখনই তিনি এই দুঃখময় জগতে ফিরে আসেন না। কারণ তিনি নিত্যধামে নিত্যানন্দময় জীবনে আসীন হন। সেই দিব্য সচ্চিদানন্দময় ধামই ভগবানের পরম ধাম। আবার সেই ভগবান যুগপৎ ব্রহ্মাণ্ডের অণু- পরমাণুতে রয়েছেন । তিনিই অংশাবতার ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রতিটি জীবের হৃদয়ে নির্বিকার সাক্ষীর মতো পরমাত্মারূপে বিরাজ করছেন। কিন্তু জীবাত্মার ক্ষুদ্র স্বাধীনতার অপব্যবহারের ফলে সে তা ভুলে যায়। এই সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন –
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্।।১৫।।
অনুবাদঃ আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমার থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয়। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ। শ্রী গীতা ১৫/১৫ ।
দ্যুলোক = আকাশ।
ভূলোক = পৃথিবী ।
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বৈকুন্ঠে অবস্থান করেন । আমরা সবাই বিশ্বাস করি , ঈশ্বর এক ও নিরাকার । সর্ব আকারেই তার অবস্থান , তাই তিনি নিরাকার ।কিন্তু উনি যদি বৈকুন্ঠে অবস্থান করেন , তবে উনি আমাদের নিয়ন্ত্রন করেন কি ভাবে ?
লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান পুরুষ।যেহেতু কৃষ্ণ শক্তিমান পুরুষ ,,তাই তাঁর থেকে অনন্ত শক্তিরও প্রকাশিত হয়েছে।যেমনঃ - সৃষ্টিশক্তি ,লীলাশক্তি ,ইচ্ছাশক্তি ,জীবশক্তি ,মায়াশক্তি , বৈকুণ্ঠে ভূ ,শ্রী যোগমায়া আদি ষোড়শ শক্তি ,তাছাড়া অন্তরঙ্গা শক্তি ইত্যাদি।
চিন্ময় জগৎ গোলোকের সমস্ত কার্যকলাপ শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে।এই অন্তরঙ্গা শক্তি তিন ভাগে বিভক্ত।যথাঃ- সন্ধিনী ,সম্বিৎ ও হ্লাদিনী।
সন্ধিনী শক্তির সাহায্যে সমস্ত চিৎ-জগৎ প্রকাশিত হয়েছে।
সম্বিৎ শক্তি বা জ্ঞান শক্তির দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে ও আমাদের জানতে পারেন।শ্রীকৃষ্ণের ভক্তেরা এই শক্তির সাহায্যে শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারেন।এই সম্বিৎ শক্তির মাধ্যমেই উনি আমাদের নিয়ন্ত্রন করেন ।
আর হ্লাদিনী শক্তির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ দিব্য আনন্দ আস্বাদন করেন এবং ভক্তরা এই হ্লাদিনী শক্তির কৃপায় কৃষ্ণপ্রেমের সমুদ্রে অবগাহন করেন।এই হ্লাদিনী শক্তির প্রতিমূর্তি হচ্ছেন শ্রীমতি রাধা ঠাকুরানী।
Comments
Post a Comment