নারায়ণ
নারায়ণ :
সনাতন ধর্মীয় উপাসকগণ বিশ্বাস করেন , প্রথমে জল সৃষ্টি হয়েছিলো বা জল সৃষ্টি করা হয়েছিল । তাই নর রুপী পুরুষ প্রথমে জলে শয়ন করে ছিলেন , তাই তিনি নারায়ণ । আবার "নারায়ণ" শব্দের অন্য অর্থে জীব যেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে ।
বেদের পুরুষ সূক্তের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোকে পুরুষের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাকে জগতের সকল চৈতন্যময় জীব ও জড় বস্তুর মধ্যে অন্তর্নিহিত এক সত্ত্বা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কাব্যিক ভাষায় তার এক হাজার মাথা, এক হাজার হাত ও এক হাজার পায়ের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে এই বিশ্বাস স্বরূপ নিয়েও তিনি মাত্র দশ আঙুল পরিমিত স্থানে জগতকে আবদ্ধ করে আছেন। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল আবির্ভূত সত্ত্বাই পুরুষ স্বয়ং। আরও বলা হয়েছে যে, তিনি তার সৃষ্টিরও বাইরে যেতে পারেন। সাকার রূপে পুরুষের বিশালত্ব এবং মনের অধিগম্য ক্ষেত্রের বাইরে তার অবস্থানকে সর্বেশ্বরবাদী
দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। সবশেষে এই পুরুষের গৌরব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তার গৌরব এই সূক্তে উল্লিখিত গৌরবের চেয়ে অনেক বেশি।
পুরুষসূক্ত অনুযায়ী, এই পুরুষের থেকেই মূল ক্রিয়ামূলক ইচ্ছাশক্তির
(যাকে বিশ্বকর্মা, হিরণ্যগর্ভ বা প্রজাপতি মনে করা হয়) উদ্ভব হয়। এই ইচ্ছাশক্তিই মহাবিশ্ব ও মহাকালের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে।
নারায়ণের আরএক নাম মুকুন্দ । এই শব্দের অর্থ, যিনি জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি অর্থাৎ মোক্ষ প্রদান করেন। আমরা সবাই জানি , আত্মার মুক্তি সনাতন ধর্মের একটি প্রধান বিষয় ।
নারায়ণকে মধূসূদন ও বলা হয়েছে। কারণ তিনি মধু নামের এক দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন ।
নারায়ণের আর এক নাম বিষ্ণু। √বিষ্ (ব্যাপ্ত হওয়া) + ণু্, কর্তৃবাচ্য। ব্যাপ্ত শব্দের অর্থে বলা হয়েছে । বিস্তৃত, প্রসারিত, আচ্ছন্ন, সর্বত্রস্থিত, সমাবিষ্ট; পরিপূর্ণ। ব্যাপ্ত হৃদয় । অর্থাৎ বিশাল হৃদয় । বিশাল যার হৃদয় তিনিই বিষ্ণু । তিনিই নারায়ণ।
বেদের বিষ্ণু মূলত সূর্য বা সবিতা। সূর্যদেবের বার রবিবার হলো বিষ্ণুবার।
বিষ্ণুদেবের প্রণাম মন্ত্র:
"ওঁ নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ। জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।।"
গোপাল ও গবিন্দ – গোবিন্দ ও গোপাল দুটি নামেরই অর্থ রাখাল । সংস্কৃতে গো শব্দের অর্থ গরু আর পাল বা বিন্দ শব্দের অর্থ অন্বেষনকারী
বা রক্ষক।
বেদ মতে গোবিন্দ সেই দেবতা যাঁর পরিপূর্ণ বেদজ্ঞান আছে।
গীতা মতে যিনি ইন্দ্রিয়ের অধিপতি । তিনিই গোবিন্দ ।
নারায়ণের এক নাম হরি । যার মৌখিক মূল 'হর' । যিনি জীবের পাপ , মন্দতা হরণ করেন বা দুর করেন তিনি হরি ।
হরি মানে বেদে পরম পরম। পরম অর্থ শ্রেষ্ঠ । পরম পরম - শ্রেষ্ঠ থেকেও শ্রেষ্ঠতর । হরিলুট মানে বিশাল বা শ্রেষ্ঠ লুট ।
হরি সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি
(১) অন্ধকার ও মায়া দূর করেন,
(২) ঈশ্বর, যিনি তাঁর ভক্তদের সমস্ত দুঃখ দূর করেন।
(৩) ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে (পরম মহাজাগতিক সত্তার প্রশংসা);
(৪) হরি হলেন পরম ঐশ্বরিক সত্ত্বার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম (যার সংস্কৃত জ্ঞান ব্রহ্ম)।
(৫) যজুর্বেদের নারায়ণ সূক্ত অনুযায়ী পরম সত্তার দ্বিতীয় ও বিকল্প নাম নারায়ণ।
(৬) হিন্দু ঐতিহ্যের মধ্যে, এটি প্রায়ই বিষ্ণুর সাথে বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে তারা এক ও একই বলে বিবেচিত হয়।
নারায়ণ বাস করেন বৈকুন্ঠে ।
জাগতিক বিশ্বের বাইরে নারায়ণের সর্বোচ্চ ও চিরন্তন অধিষ্ঠান বৈকুণ্ঠে। বৈকুণ্ঠকে হিন্দুরা আনন্দময় স্থান মনে করেন। বৈকুণ্ঠ পরমধামও (অর্থাৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান যেখানে মুক্তাত্মারা পরমেশ্বেরের
সান্নিধ্যে চিরকালের জন্য বাস করেন) বলা হয়। হিন্দুরা মনে করেন, বৈকুণ্ঠের ধারণা কোনো জাগতিক বিজ্ঞান বা যুক্তির সাহায্যে করা যায় না।
Comments
Post a Comment