মুজিব কোট

 মুজিব কোট

========
মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশি আন্দোলন ও বিদেশি পণ্য বর্জন থেকে দেশি সুতায় বোনা (চরকায় কাটা সুতা দিয়ে তৈরি) মোটা কাপড় খাদির আবির্ভাব ঘটেছিল ।
কোমর পর্যন্ত ঝুলানো নেহেরু কোট বা নেহেরু জ্যাকেট ভারতের সর্বাধিক জনপ্রিয় বন্ধগলা কোট। এর ম্যানডারিন কলারে থাকে হুক। সামনের অংশটা শেরওয়ানির ধাঁচে তৈরি।ব্যক্তিজীবনে রূচিবান পুরুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন জওহরলাল নেহ্রু। তার পরিধেয় বহুল ব্যবহৃত প্রিয় কোটটি নেহেরু কোট নামে পরিচিত। নেহেরু ফ্যাশনের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়টি হচ্ছে যে-কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে স্বতন্ত্রধর্মী এই কোটটি পরতেন তিনি। নিজের ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ এই ভিন্নতর পোষাকের মাধ্যমেই প্রকাশ করতে তিনি। ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় জওহরলাল নেহেরুর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে নেহেরু কোটের প্রচলন শুরু হয়।
অনেক অনেক গবেষকদের আলোচনা থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে , বঙ্গবন্ধু’র প্রথম মুজিব কোটটি ছিল খাদি। সেলাই করে দিয়েছিলেন, ১৬ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের নিউ লাহোর টেইলার্সে। এই টেইলার্স থেকে বঙ্গবন্ধু’র কাপড় সেলাই হতো।
মুজিব কোটের উৎস অজ্ঞাত। হতে পারে বঙ্গবন্ধু এই দুই মহান ব্যাক্তির দ্বারা পোশাক পরিচ্ছদে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন । তাই তাঁর কোটে আমরা এই দুয়ের মিশ্রণ দেখতে পাই।
২০১২ সালে টাইম সাময়িকীর জরিপে শীর্ষ ১০ রাজনৈতিক ফ্যাশনের মধ্যে স্থান পায় নেহেরু কোট। এমন নামি পোশাকের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর খাদি কাপড়ের ধুতি ও চাদর যেমন আছে, আছে চে গুয়েভারার মিলিটারি কোট ও ক্যাপ। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের মাথায় জড়ানো রুমালও বিখ্যাত। আমাদেরও আছে মুজিব কোট।
মুজিবকোটের বৈশিষ্টঃ
১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-এর কোটে ৬টি বোতাম ব্যবহার করা হতো।
২) হাতা বিহীন , হাইনেক , নিচে দুটি পকেট , কাপড়ের রং কালো ।
৩) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর মুজিব কোটের আরো একটি বিশেষত্ব হলো কলারের ভেতরের বোতাম দিয়ে আটকানো আলাদা কাপড়ের ডাবল কলার। কলার বেশি ময়লা হয় বলেই মনে হয় এই ব্যবস্থা।
বঙ্গবন্ধু পোশাক-পরিচ্ছদ খুবই সাদামাটা! সাধারণত লুঙ্গি, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি, পায়জামা পরতে ভালোবাসতেন। আরো পরতেন সিঙ্গেল কোট। চোখে থাকত মোটা ফ্রেমের চশমা আর হাতে বা ঠোঁটে পাইপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক ছাত্র তার বন্ধু তাজ উদ্দিনকে নিয়ে শেখ মুজিবরের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। শেখ মুজিবর কে তিনি অনেক কাছ থেকে দেখেছিলেন। কথাও বলেছিলেন অনেকক্ষন। কথা শেষে বঙ্গবন্ধু যখন কালো কোটটি জড়াচ্ছিলেন তখন ঐ ছাত্র লক্ষ করলেন কোট ছয়টি বোতাম। সাধারনত কোটে এর চেয়ে বেশি বোতাম থাকে। এসময় ছাত্রটি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন আপনার কোটে বোতাম ছয়টি কেন ? তখন বঙ্গবন্ধু ছাত্রটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন এর আগে এই প্রশ্ন কেউ আমাকে করে নি। তুই প্রথম। এই ৬ বোতাম আমার ছয় দফা দাবীর প্রতীক। ৬টি বোতাম মূলত বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফার প্রতিকী বহন করে।
বঙ্গবন্ধু ঠিক কত সাল থেকে হাতাবিহীন এই কালো কোট পরা শুরু করেছিলেন সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক যখন আওয়ামী মুসলীম লীগের নেতা, তখন বঙ্গবন্ধু সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে এই কোট পরতে দেখা গেছে বেশি।
বঙ্গবন্ধু জীবনের ধারাবাহিক ঘটনাবলির ছবির অ্যালবাম দেখে অনুমান করা হয় যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পূর্বে অনিয়মিতভাবে বঙ্গবন্ধু কোটটি পরলেও জেল থেকে যখন দেশে আসেন তখন থেকে নিয়মিত এই কালো কোট পরতে শুরু করেন। বলা যায় এর পর থেকে কোটটি বঙ্গবন্ধুর প্রায় ট্রেডমার্ক পোশাকে পরিণত হয়, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুসারী ও সহযোদ্ধারা পরতে শুরু করেন ।বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন জানান আগরতলা মামলার (১৯৬৮) সাল থেকে বঙ্গবন্ধু এই কালোকোট পড়া শুরু করেন।
বঙ্গবন্ধু ইংল্যান্ডে গিয়ে সেখানকার সেভিল রয় টেইলার্স থেকেও একবার কোট বানিয়ে আনিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরও এই মুজিব কোট পরেই ভাষণ দিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন সর্বোপরি নিজেকে বাঙালির ফ্যাশন আইকন হিসেবে বিশ্বের দরবারে মুজিব কোট পরে হাজির করেছেন।
মুজিব কোট সম্পর্কে আর একটি তথ্য পাওয়া যায় ।
==============================
আল্লামা শাসছুল হক ফরিদপুরী সব সময় পান্জাবির উপরে কালো কোট পড়তেন। একদিন লালবাগে হুজুরের কামড়ায় বসে শেখ মুজিবুর রহমান বসা। মুজিব বললেন, দাদা আপনার কোট আমার খুব ভাল লাগে। সাথে সাথে সদর সাহেব হুজুর নিজের পড়নের কালো কোটটি গা থেকে খুলে নাতি মুজিবকে পড়িয়ে দিলেন।
বললেন, ‘নাতি গায়ে দাওতো দেখি, তোমাকে কেমন লাগে। মুজিব পড়তেই ফরিদপুরী বললেন, দারুন তো লাগছে নেতাকে। এখন মনে হচ্ছে তোমাকে সত্যকারের জাতীয় নেতা। ঠিক আছে তোমাকে দিয়ে দিলাম। তুমি সব সময় এটা পড়ে মিটিং মিছিলে যাবে।’ সেই যে দাদাহুজরের কালো কোট শেখ মুজিবুর রহমান গায়ে পড়েছিলেন। বরকতের জন্যই কিনা কে জানে, আমৃত্যু এই কালো কোট ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গি। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় পোশাক।
আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী একজন বাংলাদেশী ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত আলেম, সমাজ-সংস্কারক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া কওমি মাদ্রাসা সহ গওহরডাঙ্গা কওমি মাদ্রাসা, ফরিদাবাদ কওমি মাদ্রাসা এবং বড় কাটারা কওমি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতা।তাঁর পিতা মুন্সি আবদুল্লাহ ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহী বিপ্লবে এবং তার দাদা চেরাগ আলী সৈয়দ আহমদ শহীদের শিখ-ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আন্দোলন করে তিনি নিজেকে যেমন গণতান্ত্রিক নেতা রূপে গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি তিনি পোশাক-পরিচ্ছদ এনেছিলেন নতুন ধারা। নিজের দেশের মানুষের কৃষ্টি কালচার ও পোশাক-আশাক নিয়ে বঙ্গবন্ধু আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এরই প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর হোটেল পূর্বাণীতে দেওয়া তার এক বক্তৃতায়, 'বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না বলেই বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ হয়নি। যে সংস্কৃতির সাথে দেশের মাটি ও মনের সম্পর্ক নেই তা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।' বঙ্গবন্ধু উপমহাদেশের একমাত্র নেতা যিনি নিজের দেশের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে কৃষ্টি ও কালচারকে এমন দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিলেন। তার মতো স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের এমন রাজনৈতিক নেতা বিশ্বে দুর্লভ।
সুত্রঃ
হাসান হামিদ : গবেষক ও কবি,যুগান্তর ১৪/০৮/২০১৭
ডিজাইনার বদরুন নাহার
মুজিববর্ষ মুজিবকোট ও নৌকা প্রতীক
মো. আবদুর রহিম
মনের মানুষ মুজিব কোট
মুকুল মল্লী ১৫ আগস্ট
দৈনিক ইত্তেফাক
শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ ১৪২১, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৫
মুজিব কোট :মানুষ থেকে পোশাক
অভিজিত্ চৌধুরী
আলেমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক
মাওলানা কাসেম শরীফ

Comments

Popular posts from this blog

” জীবন প্রেমের ফষল। আর প্রেম হলো ”মা”।”