শংকরাচার্য
ভারতের ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকদের প্রায় সবাই মনে করেন আচার্য শংকর বা শংকরাচার্য ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক।বিভিন্ন মত এবং পথে শতধা বিভক্ত সনাতন হিন্দু ধর্মকে রক্ষার জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে। সনাতন ধর্ম শাশ্বত এবং ঈশ্বর প্রবর্তিত একমাত্র মুক্তির পথ। চিরকালই এ ধর্ম ছিল আছে এবং থাকবে। এর কোন বিনাশ নেই কারণ ঈশ্বর স্বয়ং এ ধর্মের প্রবর্তক এবং রক্ষাকর্তা। তাইতো যুগে যুগে এ ধর্ম কখনো সঙ্কুচিত অথবা কখনো প্রসারিত অবস্থায় থাকে। এমনি এক সঙ্কুচিত ঘোর দুর্দিনে ভগবানের দিব্য ঐশ্বর্যের কিঞ্চিৎ কণা নিয়ে আমাদের মাঝে আসেন এবং আলোর পথ দেখান শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য। তাঁর জন্ম ৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ বৈশাখ শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কেরালা প্রদেশের ‘কালাডি’ নামক একটি ছোট্ট গ্রামে। পিতা শিবগুরু এবং মাতা বিশিষ্টা দেবী।
শঙ্করের বয়স তিন বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। শিশুকাল থেকেই শঙ্কর ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন শ্রুতিধর অর্থাৎ সবকিছু শুনেই আত্মস্থ করতে পারতেন। তিনি পাঁচ বছর বয়সে বেদ অধ্যয়নের জন্য উপনয়ন দিয়ে গুরুগৃহে গমন করেন।
শঙ্করাচার্য দুই বৎসরের মধ্যে অর্থাৎ সাত বৎসর বয়সেই বেদ-বেদাঙ্গ পাঠ সমাপ্ত করে ফেলেন। শঙ্করের মাতা বিশিষ্ট দেবী গৃহ থেকে বেশ দূরে আলোয়াই নদীতে স্নান করতে যেতেন। একদিন স্নান করে গৃহে ফেরার পথে বিশিষ্ট দেবী ক্লান্তিবশত মুর্ছিতা হয়ে পড়লেন। শঙ্কর মাকে সেবা-শুশ্রূষার দ্বারা সুস্থ করে তুললেন এবং মাকে যাতে দূরে গিয়ে স্নান করতে না হয়, সেজন্য আলোয়াই নদীকে তাঁদের গৃহের নিকট হতে প্রবাহিত হওয়ার অনুরোধ জানালেন। তারপর থেকে আলোয়াই নদী তাঁদের গৃহের নিকট হতে প্রবাহিত হতে থাকল। সত্যি এরকম মাতৃভক্তি জগতে বিরল।
সনাতন সত্য ধর্মের বিজয় পতাকা দিকে দিকে উড্ডীন করার জন্যে আচার্য শঙ্কর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন। পূর্বে কামরূপ (আসাম), ঢবাক (ঢাকা) থেকে পশ্চিমে গান্ধার (আফগানিস্তান) এবং দক্ষিণে তামিলনাডু থেকে উত্তরে তিব্বত সর্বত্র তিনি প্রচার করে বেড়িয়েছেন বৈদিক ধর্মদর্শন। বৈদিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত এবং ঈশ্বরই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।
সম্রাট অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজকোষ শূন্য করে দিয়ে বৌদ্ধমত প্রচারের নেশায় পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি যুবসমাজকে কর্মবিমুখ সন্ন্যাসের পথে প্রোৎসাহিত করেন। তিনি সৈন্যবলকে অসার ধর্মবলে রূপান্তরিত করেন। এর ফলে ভারতবর্ষের বিদেশী শক্তির প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে এবং ভারতবর্ষ পরিণত হয় দুর্বলচিত্ত ক্লীবের দেশে। ভারতবর্ষের সাথে যুগপৎ সনাতন বৈদিক ধর্মেরও এক মহাসন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়। বৌদ্ধ মত এদেশকে এমনভাবে গ্রাস করে যে, বৈদিক ধর্মের প্রাণকেন্দ্র কাশী বেনারস, (উত্তর প্রদেশ) পর্যন্ত নাস্তিক মতে ম্রিয়মান হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে কাশী তখন পূজার অভাবে গোচারণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমনি বীভৎস সময়ে ধূমকেতুর মত আচার্য শঙ্করের আবির্ভাব। তিনি বিভিন্ন নাস্তিক এবং অবৈদিক সম্প্রদায়গুলোকে স্তব্ধ করে দিয়ে সত্য সনাতনের চিরন্তন পথে আমাদের প্রবুদ্ধ করেন।
আধুনিক হিন্দু জাতিকে প্রথম একটি সাংগঠনিক রূপ দেন শঙ্করাচার্য। তিনিই প্রথম সনাতন ধর্ম রক্ষায় সংঘের পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেন। অবশ্য সংঘের ধারণা প্রাচীনকাল থেকে ছিল কিন্তু তা ছিল বিচ্ছিন্ন, অপূর্ণাঙ্গ এবং প্রয়োগহীন। তাঁর প্রবর্তিত সংঘই ধর্ম রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানই ‘শঙ্কর মঠ’ নামে আমাদের কাছে পরিচিত। ‘শঙ্কর মঠ’ কোন একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে ভারতবর্ষের চারপ্রান্ত থেকে চারটি মঠের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। এ চারটি মঠ ছিল সনাতন ধর্ম রক্ষায় চারটি দুর্গের ন্যায়। সিন্ধু, সৌবীর, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমাঞ্চলের জন্য শারদা মঠ; অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, উৎকল, গৌড়, সুক্ষ্ম, পৌন্ড্র, ব্রহ্মপুত্র তীরবাসীসহ সমগ্র পূর্বাঞ্চলের জন্য গোবর্দ্ধন মঠ; কুরুক্ষেত্র, কাশ্মীর, কম্বোজসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের জন্য জ্যোতি মঠ এবং অন্ধ্র, দ্রাবিড়, কর্ণাট, কেরল প্রভৃতি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শৃঙ্গেরী মঠ। শঙ্করাচার্য এ চার মঠের আচার্য হিসেবে নিযুক্ত করেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম চার শিষ্যকে সুরেশ্বর, পদ্মপাদ, তোটক এবং হস্তামলক। এ চার আচার্য চার মঠ থেকে চার বেদের পূর্ণাঙ্গ বৈদিক জীবন বিধানের শিক্ষা দিতে থাকেন দিকে দিকে। ফলে সনাতন ধর্ম একটি সুদূর সাংগঠনিক রূপ পায়।
শঙ্করাচার্য অধ্যাত্ম পথের পথিক এবং সাধারণ গৃহীদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য চার মঠের অন্তর্ভূক্ত একদল সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন যারা ‘দশনামী সন্ন্যাসী’ সম্প্রদায় নামে খ্যাত। ফলে ভারতবর্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী এক সন্ন্যাসী সম্প্রদায়। ভারতবর্ষের অধিকাংশ ধর্মীয় মত, পথের সংগঠন এ চারমঠ এবং দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত। সন্ন্যাসীর আত্মপরিচয় এই পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দের বিবরণ থেকে জানা যায় ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ’ শঙ্করাচার্যের শৃঙ্গেরী মঠের অধিভূক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের প্রাণপুরুষ শ্রীগৌরাঙ্গদেব দুজন গুরুর কাছে মন্ত্রদীক্ষা এবং সন্ন্যাস নিয়েছিলেন; তাঁরা হলেন শ্রী ঈশ্বরপুরী এবং শ্রী কেশব ভারতী। তাঁরা দুজনেই শৃঙ্গেরী মঠভূক্ত সন্ন্যাসী। এমনকি যে নামে শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমাদের মাঝে খ্যাত ‘শ্রীচৈতন্য’; এই ‘চৈতন্য’ নামটি শৃঙ্গেরীমঠভূক্ত ব্রহ্মচারী উপাধি। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যও শঙ্করাচার্যের দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত সন্ন্যাসী।
আচার্য শঙ্কর ছিলেন যুক্তিবাদিতার এক অত্যুজ্জ্বল বিগ্রহ। তিনি যুক্তি বিহীন কোন কথা বলতেন না। যে কথাই বলতেন তার পিছনে থাকতো তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি। সে অকাট্য যুক্তির জাল ছিন্ন করা ছিল দুঃসাধ্য। কারণ তিনি ছিলেন সত্যে প্রতিষ্ঠিত। তাই তিনি যা বলেছেন তাই সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বৈদিক ধর্মের পুনরুত্থান ঘটালেন শুধুমাত্র যুক্তি, মেধা, প্রজ্ঞার সহায়তায়। না কোন রক্তপাত না কোন হানাহানি, না কোন রাজশক্তির ক্ষমতার অপপ্রয়োগে। কোন কিছুই ধ্বংস করেন নি, করেছেন সৃষ্টি, পুনঃপ্রবর্তন। বশিষ্ট-ব্যাসের ন্যায় মেধা প্রজ্ঞার সাথে অসাধারণ সারল্য, লাবণ্য ছিল তাঁর সারা দেহে, তাই তাঁকে দেখে, তাঁর কথা শুনে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না।
শংকর মনে করেন, ব্রহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা । জীবো ব্রহ্মৈব নাপর: অর্থাৎ একমাত্র ব্রহ্মই সত্য, জগৎ মিথ্যা এবং জীব ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর মতে একমাত্র ব্রহ্মেরই সত্তা আছে। ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সত্তা নেই। ব্রহ্ম নিত্য-শুদ্ধ, নিত্য-বুদ্ধ এবং নিত্য-মুক্ত। ব্রহ্ম দেশ কালাদি ভেদশূন্য। সেখানে তিন ধরণের ভিন্নতা লক্ষণীয়: সমজাতীয় ভিন্নতা, অসমসত্ত্ব ভিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা। কিন্তু ব্রহ্মের অনুসারিরা এরূপ পার্থক্যের উর্ধ্বে। তাঁর মতে ব্রহ্মই শুদ্ধ অভিন্নতার একমাত্র উদাহরণ। ব্রহ্ম নির্গুণ। অজ্ঞানতার কারণে নির্গুণ ব্রহ্মকে সগুণ মনে হয়।
শংকরের মতে ব্রহ্মই সত্য তাঁর এই মত প্রমাণ করতে তিনি সত্যের সন্দেহাতীত মানদন্ডের কথা বলেছেন। যেমন; ১. সত্য সব রকম পরিবর্তনের উর্ধ্বে ২. সত্য অবশ্যই প্রত্যক্ষণযোগ্য ৩. সত্য অবশ্যই যেকোনো অসঙ্গতির উর্ধ্বে। তিনি মনে করেন, ব্রহ্মের চেয়ে কোনো কিছুই পরিবর্তনের উর্ধেব নয়, কোনো কিছুই নিজ অস্তিত্বের উর্ধ্বে নয় এবং কোনো কিছুই কোনো অসঙ্গতির উর্ধ্বে নয়। একারণে ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। আবার জগতের অসত্যতা প্রমাণ করতে শংকর অনেকগুলো যুক্তি উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে দুটি যুক্তি প্রধান। (১) যা কিছু পরিবর্তনশীল তা সত্য নয়। জগতের সব কিছু পরিবর্তনশীল। তাই জগতের কোনো কিছু সত্য নয়। (২) যা কিছু প্রত্যক্ষণযোগ্য, তাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জগৎ প্রত্যক্ষণযোগ্য। তাই জগতের সব কিছু ধ্বংসযোগ্য। আবার যা কিছু ধ্বংসযোগ্য, তা সত্য নয়। জগতের সব কিছু ধ্বংসযোগ্য। কাজেই জগতের কোনো কিছুই সত্য নয়।
সাত বছর থেকে শঙ্কর সন্ন্যাস গ্রহণের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে অণুমতি দিতে চাইছিলেন না। শেষে তিনি খুব আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের অণুমতি পান। কথিত আছে, একদিন তিনি পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তাঁর পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মাও সেই সময় পূর্ণার তীরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অণুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাঁকে সন্ন্যাস গ্রহণের অণুমতি দিলেন। তার পর থেকে কোনোদিন পূর্ণা নদীকে কোনো কুমিরকে দেখা যায়নি।
শঙ্কর কেরল ত্যাগ করে গুরুর খোঁজে উত্তর ভারতের দিকে রওনা হলেন। নর্মদা নদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি গৌড়পাদের শিষ্য গোবিন্দ ভগবদপাদের দেখা পান। গোবিন্দ শঙ্করের পরিচয় জানতে চাইলে, শঙ্কর মুখে মুখে একটি শ্লোক রচনা করেন। এই শ্লোকটিই অদ্বৈত বেদান্ত তত্ত্ব প্রকাশ করে। গোবিন্দ তা শুনে খুব খুশি হন এবং শঙ্করকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
গোবিন্দ শঙ্করকে ব্রহ্মসূত্রের একটি ভাষ্য লিখতে এবং অদ্বৈত মত প্রচার করতে বলেন। শঙ্কর কাশীতে আসেন। সেখানে সনন্দন নামে এক যুবকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে যায়। এই যুবকটি দক্ষিণ ভারতের চোল রাজ্যের বাসিন্দা ছিল। সে-ই প্রথম শঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কথিত আছে, কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করতে যাওয়ার সময় এক চণ্ডালের সঙ্গে শঙ্করের দেখা হয়ে যায়। সেই চণ্ডালের সঙ্গে চারটি কুকুর ছিল। শঙ্করের শিষ্যরা চণ্ডালকে পথ ছেড়ে দাঁড়াতে বললে, চণ্ডাল উত্তর দেয়, "আপনি কী চান, আমি আমার আত্মকে সরাই না এই রক্তমাংসের শরীরটাকে সরাই?" শঙ্কর বুঝতে পারেন যে, এই চণ্ডাল স্বয়ং শিব এবং তার চারটি কুকুর আসলে চার বেদ। শঙ্কর তাঁকে প্রণাম করে পাঁচটি শ্লোকে বন্দনা করেন। এই পাঁচটি শ্লোক "মণীষা পঞ্চকম্" নামে পরিচিত।
এভাবে শঙ্কর অলৌকিক উপায়ে মাতার নিকট সন্ন্যাসের অনুমতি নিয়ে গৃহত্যাগ করলেন। তবে যাওয়ার আগে তিনটি প্রতিজ্ঞা করে গেলেন। প্রতিজ্ঞা তিনটি এরকম- তিনি মায়ের মৃত্যুকালে তাঁকে দর্শন দিবেন, মায়ের মৃত্যুকালে তাঁকে ভগবান দর্শন করাবেন এবং তিনি নিজে মায়ের সৎকার করবেন।
শঙ্কর গৃহত্যাগ করে নর্মদা-তীরে এসে গোবিন্দপাদ নামক এক সিদ্ধ-পুরুষের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শঙ্করাচার্য গুরুর নির্দেশে বেদান্ত প্রচারের জন্য কাশীধাম গমন করেন। পরে সেখান থেকে বদরিকা আশ্রমে এসে গুরুর নির্দেশমত উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও গীতার ভাষ্য রচনা করেন। শঙ্করের বয়স ষোল বৎসর পূর্ণ হলে মহর্ষী ব্যাসদেব এসে তাঁর আয়ু আরও ষোল বৎসর বর্ধিত করে যান।
শঙ্কর বেদান্ত প্রচারের নিমিত্ত সশিষ্য ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন এবং বিভিন স্থানের পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে বেদামন্ত দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তিনি আকাশ-পথে উড়ে এসে মীমাংসাকার কুমারিল ভট্টের শিষ্য মণ্ডনকে তর্কশাস্ত্রে পরাজিত করেন। একদিন শঙ্করের পাণ্ডিত্ব্যে ইর্ষান্বিত হয়ে উগ্রভৈরব, ক্রবাচ প্রভৃতি কাপালিকরা তাঁকে হত্যা করতে এসে অলৌকিক উপায়ে উল্টো নিজেরাই নিহত হন।
শঙ্করাচার্য একদিন সূক্ষ্মদেহে অমরুক নামক রাজার মধ্যে প্রবেশ করে স্ত্রী সম্বন্ধে অনেক বিষয় শিক্ষা অর্জন করে একটি স্ত্রী-চরিত্র সম্বন্ধীয় গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি মাতা বিশিষ্টা দেবীর মৃত্যুর পূর্বকালে শূন্যপথে মায়ের নিকট উপস্থিত হয়ে পূর্বের তিনটি প্রতীজ্ঞা পালন করেন। শঙ্করাচার্য কাশী, কাঞ্চী, কর্ণাট, কামরূপ প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করে বেদান্ত মত প্রচার করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে তিনি কাশ্মীর গমন করেন। সেখানের প্রচারকার্য শেষ হলে বদরিকাশ্রমে চলে যান এবং শিষ্যদের তাঁর প্রতিষ্ঠিত মঠে গিয়ে প্রচারকার্য করার নির্দেশ দেন। কিন্তু শিষ্যরা গুরুসঙ্গ ত্যাগ করতে সম্মত না হওয়ায় তাঁদের সঙ্গে কিছুদিন হিমালয়ের কেদারধামে বাস করেন। তারপর সেখানে তাঁর বয়স বত্রিশ বৎসর পূর্ণ হলে মহাসমাধি যোগে তিনি দেহত্যাগ করেন।
দশনামী সন্ন্যাসী ঃ-
ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা । প্রজাসৃষ্টির জন্য ব্রহ্মা পঞ্চপুত্র উৎপন্ন করলেন । পঞ্চপুত্র প্রজাসৃষ্টিতে অমনোযোগী হয়ে কঠোর তপস্যায় মনোনিবেশ করলেন । এতে রুষ্ট ব্রহ্মা ললাট থেকে একাদশ রুদ্র সৃষ্টি করলেন - তাঁরা হলেন - মহান , মহাত্মা, মতিমান, ভীষণ, ভয়ন্কর , ঋতু, উদ্ধর্কেশ,পিঙ্গলাক্ষ, রুষ্টি, শুচি ও কালাগ্নি ।
তাঁদের স্ত্রীরা হলেন যথাক্রমে কলা, কলাবতী, কাষ্ঠা, কালিকা, কলহপ্রিয়া, কন্দলী, ভীষণা, রাসুনা, প্রমাদা, ভূষণা ও শুক্লী ।
মহান রুদ্রেরে ঔরসে বিন্দু নাথ জম্ম নিলেন । বিন্দু নাথের সাথে বিয়ে হল ব্রহ্মণ কাশ্যপকন্যা কৃষ্ণার । বিন্দু নাথের ১৬ টি পুত্র জম্মগ্রহণ করেন ।
প্রথম ৬ জন তথা ১। আদি নাথ ২। মীন নাথ ৩।সত্যনাথ ৪। সচেতন নাথ ৫। কপিল নাথ ও ৬। নানক নাথ , তাঁরা সকলে গৃহী হলেন । অপর ১০ জনের নাম ১। সরস্বতী ২। পুরী ৩। ভারতী ৪। গিরি ৫। পর্বত ৬। সাগর ৭। বন ৮। অরণ্য ৯। তীর্থ ১০। আশ্রম - এরা সকলেই গৃহত্যাগী ধারা দশনামী সন্ন্যাসী নামে পরিচিত ।
Comments
Post a Comment