শিবসেনা

 শিবসেনা

======
ছত্রপতি শিবাজীর কাছে যুদ্ধে হেরে নিজের একটা আংগুল ও সন্তান হারিয়ে শাস্তি স্বরুপ মোঘল শাসক শায়েস্তা খাঁকে দুর মুল্লুক বাংলার সুবেদার হিসাবে পাঠিয়েছিলেন ।যদিও শায়েস্তা খান মুঘল আমলে বাংলার একজন বিখ্যাত সুবেদার বা প্রাদেশিক শাসক ছিলেন। তার খ্যাতি মূলত বাংলার সুবাদার হিসাবে। দু'দফায় সর্বমোট ২২ বছর তিনি বাংলা শাসন করেন। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা ছিলেন। তার শাসনামলে ঢাকার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় । তার শাসনামলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেতো। এর উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলির মধ্যে একটি ছিল মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়।
না এরা কিন্তু দেবাদিদেব শিবের আদর্শের সাধু সন্নাসী সেনা নয় , এরা শিবাজী ছত্রপতির আদর্শে গড়া শিবসেনা । রাজা দাহিরের পতনের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে যে স্থানীয় রাজা তথা হিন্দু আধিপত্য রোধ হয়েছিল , মহারাষ্ট্রের শিবাজী আবার সেই স্থানীয় আধিপত্য তথা হিন্দু আধিপত্যের সূচনা করতে চেয়েছিলেন ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়
“মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো
'জয়তু শিবাজি'।
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পুরব
দক্ষিণে ও বামে একত্রে করুক ভোগ একসাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে॥”
শিবাজি ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে শিবনেরি পার্বত্য দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন শাহজী ভোঁসলে ও মাতা জীজাবাঈ। শিবাজির পিতা শাহজী বিজাপুরের সুলতানের অধীনে কার্যভার গ্রহণ করায়, শিশুপুত্র শিবাজীসহ জীজাবাঈ দাদাজী কোণ্ডদেব নামে এক বিচক্ষণ ব্রাহ্মণের তত্ত্বাবধানে পুনায় থেকে যান। ধর্মপরায়ণ মায়ের প্রভাব শিবাজীর জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল। মায়ের কাছে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী শুনে শিশুকালেই শিবাজীর মনে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের সঞ্চার হয়েছিল। মায়ের মতো কোণ্ডদেবও শিবাজীর চরিত্র গঠনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
শিবাজী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সামান্য এক জায়গিরদারের অবহেলিত পুত্র শিবাজী নিজের প্রতিভাবলে স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি শতধা বিভক্ত ও পারস্পরিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব-এ লিপ্ত মারাঠাদের জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে এক শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছিলেন। তার শাসননীতির লক্ষ্য ছিল ন্যায়পরায়ণতা ও উদারতা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের মতে-
“ শিবাজী যে শুধুই মারাঠা জাতির স্রষ্টা ছিলেন এমন নয়, তিনি ছিলেন মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান জাতীয় স্রষ্টা ”
একবার দিল্লির বাদশাহ অরঙ্গজেব ভুলবশত রাজা কে ধরে নিয়েছিল। শিবাজী "যে যেমন তার সাথে তেমন"এই নীতি প্রয়োগ করে। তিনি জেল থেকে বাইরে বেরোনোর আগ্রহ ছেরে দিল। পাহারাদার দের নজর তার থেকে কম হতে লাগল। শিবাজী জানত অরঙ্গজেব এর শাসন এ এমন অনেক লোক আছে যারা তার বিরোধী , এর মধ্যে অরঙ্গজেব এর পত্নী ও ছিল। এই ভাবে ওইসব কে শিবাজী নিজের জালে ফাসায় , এবং অরঙ্গজেব এর পাহারাদার দের চকমা দিয়ে জেল থেকে পালায়। বাঘ খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। এর থেকে শিবাজী র চতুরতা এবং নীতিবিদ এর পরিচয় পাওয়া যায়।
শেষপর্যন্ত রাজার বাড়ন্ত শক্তি দেখে অরঙ্গজেব রাজার সাথে চুক্তি করে নেয়। শিবাজী র সাথে পুনা, চাকণ , সুপা ইত্যাদি সব মিলে গেল। সিবাজীর বাল্য বন্ধু তানাজী মালখুরে এর সহায়তায় এক বিশাল সেনার দল গঠন করে সিংগড় এর প্রসিদ্ধ দুর্গ কে দখল করে নেয়।
আর একবার বিজাপুর রাজ্যে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে শিবাজী ১৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম তোরণা দুর্গটি দখল করে নেন। এরপর তিনি একে একে বড়মতি, রায়গড়, পুরন্দর, প্রভৃতি স্থানের দুর্গগুলি দখল করে নেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং শিবাজীকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিজাপুরের সুলতান শিবাজীর পিতা শাহজীকে কারারুদ্ধ করেন। এই অবস্থায় শিবাজী দাক্ষিণাত্যের মোঘল শাসককর্তা মুরাদের সাহায্য চান। বিজাপুরের সুলতান ভীত হয়ে শাহজীকে মুক্ত করে দেন। কিছুকাল শিবাজী নিশ্চুপ থাকেন। ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা ঔরাঙ্গজেবের সঙ্গে বিজাপুরের সুলতানের সংঘাতের সুযোগ নিয়ে শিবাজী জাওলি নামে এক অঞ্চল দখল করেন। ইতিমধ্যে ঔরাঙ্গজেব শাহজাহানের অসুস্থতার সংবাদে দিল্লী চলে গেলে, বিজাপুরের সুলতান শিবাজীকে দমন করার জন্য সেনাপতি আফজল খাঁকে পাঠান। আফজল খাঁ শিবাজীকে দমন করতে ব্যর্থ হলে প্রতারণার আশ্রয় নেন। আফজল খাঁ শিবাজীকে তার শিবিরে আমন্ত্রণ জানান। শিবাজী আফজল খাঁর দুরভিসন্ধিরর কথা আগেই জানতে পেরেছিলেন। সুতরাং তিনি প্রস্তুত হয়েই আফজল খাঁর শিবিরে আসেন। আফজল খাঁ আলিঙ্গনের সুযোগে শিবাজীকে ছুরির আঘাত করতে উদ্দ্যত হলে শিবাজী লোহার তৈরি 'বাঘনখ' অস্ত্রের সাহায্য-এ আফজল খাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করেন। সেনাপতির মৃত্যুতে বিজাপুরের সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে শিবাজী কোলাপুর দখল করে নেন।
আফজাল খান এর মৃত্যুতে দিল্লি-র বাদশারা আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল। অরঙ্গজেব এর অবস্তা খারাপ হয়ে যায়। সে শায়েস্তা খান কে এক বিশাল সেনার সাথে শিবাজী কে আক্রমণ করার জন্য পাঠায়। রাজা কে এই বিশাল সেনার আগে হারতে হয়েছিল। এবং দুই বছর ছোট ছোট যুদ্ধ হতে থাকে। রাজা সুজোগ পেলে মুঘল সেনাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ত ,কিন্তু তেমন কোন সফলতা পান নি।
পুনাতে শায়েস্তা খান এর রাজ্য ছিল। মুঘল সেনারা পুনার দুর্গ তে হুল্লোড় নিয়ে ব্যাস্ত ছিল।
কিন্তু রাজা চুপ থাকার লোক ছিলেন না, রমজান মাসে রাত ১২ টার সময় রাজা সহ চারশো লোক দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করে। আওয়াজ শুনে লোকেরা শায়েস্তা খান কে জাগায়। সে ভাল করে উঠেই নি এই সময় শিবাজী ( Chhatrapati Shivaji ) মাথার কাছে এসে পরে, ঠিক তখুনি কেও আলো নিভিয়ে দেয়। অন্ধকারে শায়েস্তা খান পালিয়ে গেল এবং পালাবার সময় তার আঙুল শিবাজীর তলোয়ার এ কেটে যায়। শায়েস্তা খান এর ছেলেও মারা গেল। পুনের দুর্গ তে পাখিও ঢুকতে পারত না সেখানে শিবাজী টার বুদ্ধি দিয়ে তার সাথীদের নিয়ে বেশ বরযাত্রী হিসাবে বদলে নগরে প্রবেশ করে। এই জীত এর পর দক্ষিণ এর হিন্দু শিবাজী কে অজয় বলে সম্বোধন করে।
বাল্যকালেই মহারাষ্ট্র দেশ সম্পর্কে এবং স্থানীয় পার্বত্য মাওয়ালি জনগোষ্ঠীরর সাথে শিবাজীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। এই মাওয়ালিদের নিয়েই তিনি সর্বপ্রথম বিশ্বস্ত এক সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। ১৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে কোণ্ডদেবের মৃত্যুর পর, শিবাজী রাজ্যজয়ে মনোনিবেশ করেন। রোলিনসন (Rawlinson) মনে করেন যে, বিদেশী শাসন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করাই শিবাজীর রাজ্যজয়ের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। সম্পদের লোভে লুঠতরাজ করা তার অভিপ্রেত ছিল না। সরদেশাই বলেন, সারা ভারতে হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপন করাই শিবাজীর লক্ষ্য ছিল।
মহারাষ্ট্রের শিবসেনা তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক দল । যারা এবার রাজ্যক্ষমতায়।

Comments

Popular posts from this blog

” জীবন প্রেমের ফষল। আর প্রেম হলো ”মা”।”