এ অঞ্চলের ধর্মীয় ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুক্তির পথ দেখাতে পারে তৎকালীন মুসলীমলীগ।
এ অঞ্চলের ধর্মীয় ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুক্তির পথ দেখাতে পারে তৎকালীন মুসলীমলীগ।
========================================
আমরা মুসলীম লীগের অনেক সমালোচনা করি । কিন্তু আমি পড়তে গিয়ে দেখেছি ভারত বর্ষের মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষ জন পেয়েছিলেন অনেক অনেক নেতা , যারা মনে প্রানে মুসলিমদের ভালবাসতো । এই ভালবাসা কিন্তু আবার অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা থেকে নয় । স্যার সৈয়দ আহমেদ থেকে শেখমুজিবুর রহমান , মাঝখানে জীন্নাহ সাহেব , শেরেবাংলা একে ফজলুল হক প্রমুখ । এই মানুষ গুলো মন থেকে তাদের ধর্মালম্বী মানুষদের নিয়ে চিন্তা করত । তারা ভাবত কি ভাবে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের পিছিয়ে পড়া থেকে সামনে আনা যায় । এই চিন্তার মধ্যে ছিলোনা কোন ব্যাক্তিগত স্বার্থ । আমি ইচ্ছা করেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নাম এ দলে রাখতে পারছিনা । উনি ছিলেন কট্টর বাদী ও উচ্চবিলাসী নেতা । আমি দেখেছি বাংলাদেশের অনেক বড় বড় দলের সনাতন সম্প্রদায়ের নেতা তার মাজারে ফুল দিয়ে আসেন । আসলে তারা কলকাতা দাঙ্গা ও নোয়াখালি দাঙ্গায় নিহত মানুষের কথা মনে রাখেন না বা অতিরিক্ত স্বার্থপরতার কারনে মনে রাখতে চান না ।
জিন্নাহ সাহের তো পাকিস্থান সৃষ্টির পর বলেই ফেলেছিলেন এখন থেকে পাকিস্থান শাসিত হবে অসম্প্রদায় চেতনার ভিত্তিতে । তার কথা শুনলে আজকে পাকিস্থানের এই অবস্থা হতোনা । এক দিকে ভালই হয়েছে । আমরা স্বাধিন হয়েছি ।
কিন্তু ঐ মানুষগুলো অন্যধর্মের মানুষদের ঘৃনা দুরের কথা খারাপ চিন্তাও করতোনা । কারণ তাঁরা ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ সত্যিকারের মুসলিম নেতা ।
এই যেমন দেখুন স্যার সৈয়দ আহমদ - পশ্চাৎপদ মুলমানদের উচ্চ শিক্ষা বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন উপলব্ধি করে তিনি বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে তিনি ১৮৫৮ সালে মোরারাদাবাদে একটি বিদ্যালয় খোলেন। একই ভাবে তিনি ১৮৬৪ সালে গাজীপুরে ‘আলিগড় বৈজ্ঞানিক সমিতি’ যার উদ্দেশ্য ছিল পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বই ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা। তিনি ১৮৭৬ সালে মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। এছাড়া তিনি ‘তাহজিব-উল-আখলাক’ নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন। তদুপরি তিনি কমিটি ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং নামে একটি সংস্থা স্থাপন করেন।
তার চিন্তাধারা ও কাজকর্ম ভারতবর্ষে মুসলমানদের মধ্যে একটি নতুন চেতনার জন্ম দেয়। এর প্রভাবে প্রভাবান্বিত এই মুসলমান বুদ্ধিজীবীরাই পরবর্তীতে আলিগড় আন্দোলনের সূচনা করেন যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিমদের অধিকার নিশ্চিত করা।
১৮৭৭ সালে সৈয়দ আমীর আলীর উদ্যোগে 'সেন্ট্রাল মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন' গঠনের সাথে স্যার সৈয়দ আহমদ খান দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মুসলমানদেরকে রাজনীতি থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস আত্মপ্রকাশ করার পর হিন্দি এবং উর্দু'র বিরোধ সৃষ্টি হলে মুসলমানদের স্বার্থের ব্যাপারে সৈয়দ আহমদ সচেতন হয়ে উঠেন এবং ১৮৮৯ সালে রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে 'ইউনাইটেড ন্যাশনাল ডিফেন্স এ্যাসোসিয়েশন' গঠন করেন। ১৮৯৩ সালে উত্তর ভারতে 'মোহমেডান এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অরগানাইজেশন অব আপার ইন্ডিয়া' গঠিত হয়। ১৯০৩ সালে সাহরানপুরে মুসলিম রাজনৈতিক সংস্থা গঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঞ্জাবে 'নিখিল ভারত মুসলিম লীগ' নামে একটি রাজনৈতিক সংস্থা গঠিত হয়। এদিকে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় সমগ্র ভারত জুড়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ এবং মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় বয়ে যাওয়ায় স্যার সলিমুল্লাহকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তোলে। তিনি সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলিম ঐক্যের কথা ভাবতে শুরু করেন।
১৯০৬ সালের নভেম্বরে সলিমুল্লাহ সমগ্র ভারতের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের নিকট পত্রালাপে নিজের অভিপ্রায় তুলে ধরেন এবং সর্বভারতীয় মুসলিম সংঘের প্রস্তাব রাখেন। ১৯০৬ সালের ২৮-৩০শে ডিসেম্বর সর্বভারতীয় শিক্ষা সম্মেলন আহুত হয়। শাহবাগে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে সমগ্র ভারতের প্রায় ৮ হাজার প্রতিনিধি যোগ দেন। নবাব সলিমুল্লাহ 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফেডারেন্সী' অর্থাৎ সর্বভারতীয় মুসলিম সংঘ গঠনের প্রস্তাব দেন; হাকিম আজমল খান, জাফর আলী এবং আরো কিছু প্রতিনিধি প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেন। কিছু প্রতিনিধির আপত্তির প্রেক্ষিতে কনফেডারেন্সী শব্দটি পরিত্যাগ করে লীগ শব্দটিকে গ্রহণ করা হয়। অবশেষে সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ' বা নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয়। তারই পরিণতি পাকিস্থান ও পরবর্তীতে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ ।
প্রত্যেক জাতির মধ্যে ধর্মীয় ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু সৎনেতৃত্ব আসতে হবে। যারা ব্যাক্তিগত স্বার্থ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবে । তবেই তো তারা তাদের সম্প্রদায়ের অবহেলিত নিষ্পেষিত সম্প্রদায়কে মুক্ত করতে পারবে । এখন যদি ঘটনা এরকম হয় , নিজ ধর্মের মানুষদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে , সরকারী দলের বা বড় রাজনৈতিক দলের পদ পদবী নিজের আয়ত্ত করা অথবা এক পদে দিনে পর দিন আঁকরে ধরে বসে থাকা । তবে তো সেই ধর্মালম্বী মানুষদের মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় ।
১৯৪৭ সালে তৎকালীন কিছু হিন্দু নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারনে বাংলাদের তথা তৎকালীন পূর্বপাকিস্থানের হিন্দুরা হঠাৎ করে ভারত বর্ষের সংখ্যাগুরু ধর্মালম্বী থেকে সংখ্যলঘুতে পরিণত হয়ে গেছে। যার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলোনা । আস্তে আস্তে তাদের উপর নেমে আসে অনেক রকম অত্যাচার , নীপিড়ন ইত্যাদি । পরিনামে তারা মাতৃভূমি ছেড়ে নিরুদ্দেশে চলে যায় । আস্তে আস্তে তারা সংখ্যায় কমতে থাকে । সেই সংগে কমে যায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা , কমে যায় আর্থিক ভাবে অবস্থা সম্পন্ন মানুষের সংখ্যাও ।
হঠাৎ করেই হতাশা গ্রস্থ মানুষদের আশার আলো দেখাতে উদিত হোন অন্যধর্মের একজন । তিনি আশার বাণী শোনার । তিনি পূর্বপাকিস্থানকে পূর্ববাংলা বানাতে চান , তিনি ধর্মীয় বিবেচনায় নয় , ভাষা ও সংস্কৃতির বিবেচনায় এই অঞ্চলের জাতিকে দেখতে চান । যিনি রবীন্দ্রনাথকে আঁকরে ধরতে চান , তার প্রেরণায় নিজে্কে উজ্জীবিত করতে চান । তিনি বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তাঁকে ঘিরেই এই অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতানার মানুষ গুলো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে থাকে। ভালই চলছিলো । একটা নতুন আশা নতুন স্বপ্ন । ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ ।এই অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আরও নিষ্পেষিত । দেশ থেকে পাশের দেশে পলায়ন । স্বাধিন হওয়ার পর আবার দেশে ফেরত। প্রায় কারোই বাড়ীঘর নেই । তারপরেও মনের শক্তিতে আবার জেগে উঠা । কারণ তাদের আছে বংগবন্ধু । তাঁকে সামনে রেখে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া । কিন্তু সুখ এ ধর্মালম্বীদের বেশীদিন সইলোনা । ১৯৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট সব স্বপ্ন একবারেই শেষ। প্রায় ৫০ বছর থেকে এই বাংলাদেশে হিন্দুরা ভুগছে। মানুষগুলো কেউ ক্ষিপ্র নয় , আছে বুদ্ধি ধৈর্য ,শেখার আগ্রহ । অর্থাৎ নিজেকে উন্নত করার সবধরনের মশলা । নেই শুধু সঠিক হিন্দু নেতৃত্ব । যদি এ অঞ্চলের ধর্মীয় ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা মুসলীললীগের তৎকালীন নেতৃত্বের মত নেতা পায় তবেই এদের মুক্তি ।ততদিন অপেক্ষা করা ছাড়া কোন রাস্তা জানানেই । যে ধর্মের বেশীর ভাগ মানুষ নিজের নেতৃত্বের দ্বারা বঞ্চিত তাদের কপালেতো দুঃখ থাকবেই । তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই । আমরা তো একসময় এই কথাগুলোও বলতে পারতাম না , এখন তো বলতে পারি । আমার মত অনেকেই অপ্রিয় সত্য কথা বলে দেয় । ফলাফল একদিন আমরা সঠিক নেতৃত্ব পাব।
Comments
Post a Comment