অসুর জাতি আজও রয়েছি !

 অসুর জাতি আজও রয়েছি ! -মনোজ ভট্টাচার্য

--------------------------------------------------------
অসুর জাতি আজও রয়েছি – সুষমা অসুর !
বছর খানেক আগে আমি এই বিষয় নিয়ে কিছু লিখেছিলাম – ‘অসুর উপজাতি কি মহিষাসুর বংশদ্ভুত’ ! মনে পড়ছে ! তখন বিখ্যাত সমাজকর্মী সুষমা অসুর কলকাতায় কোন এক দুর্গা মণ্ডপে অসুর সম্প্রদায়কে নিয়ে কিছু বক্তব্য রেখেছিল ।
এবারের শিলাদিত্য পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় সুষমা অসুরের এই বিষয় লেখা একটা নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে ! – প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে হতবাক হতে হয় – কত পরিশ্রম করে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন ! – আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে – এই প্রবন্ধে লেখিকা তথ্যের জোরে বাস্তবের ওপর ভিত্তি করে পুরনো অনেক আজগুবি ধারনা বা ফ্যান্টাসি ভেঙ্গে দিয়ে আসল সত্য প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছেন ! খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ হাজার বছর ধরে অসুর জাতির ইতিহাস তুলে ধরেছেন ! ঋকবেদ থেকে উপনিষদ যে আসলে অসুরকুলের বাইগা বা ঋষিদের রচনা - তারই আলোচনা করেছেন !
যতই আমরা মহালয়ার সকালে ‘ইয়া দেবী’ বলে নানান অস্ত্র সামগ্রি দিয়ে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার বন্দনা করি না কেন, কাল্পনিক ঐ দেবীর সত্যি কি কোন ক্ষমতা থাকে ভারতের ভূমিপুত্র অসুর জাতিকে নিকেশ করার ! কাল্পনিক দেব-দেবী যতই শক্তিমান হোক না কেন , এই বাস্তব পৃথিবীতে কখনও কোন জলজ্যান্ত মানুষকে খতম করতে পারে না । অসুর জাতিকে কেউ যে নিকেশ করতে পারেনি – তার বড়ো প্রমান হল ৬,০০০ খৃস্ট পূর্বাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত – এই ৮,০০০ বছর ধরে একমাত্র অসুররাই স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও রক্তধারা নিয়ে আজও বহাল তবিয়তে রয়েছে । ফ্রেড্রিক ম্যস্কমুলার ও এ এল ব্যাসাম ও তাদের অনুগামী কিছু শ্বেতাঙ্গ পণ্ডিত আর্যতন্ত্র বলিয়ান হয়ে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক – দেবতাদের সঙ্গে নাকি অসুরদের লড়াই হয়েছিল ! আদিকালে যে সুর ও অসুরদের মধ্যে লড়াই হয়েছিল, তার সঙ্গে নাকি আজকের আমাদের অর্থাৎ অসুরদের কোন সম্পর্কই নেই
অসুর জাতির সত্যাসত্য নিরুপনের জন্যে খুব সম্প্রতি অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া ‘অ্যানথ্রোপোমেট্রি’ ব্যবহার করতে শুরু করে - ১৯৬৩ সালের আগে অবশ্য ম্যাকফারলেন ও বিহার সরকার ছোটনাগপুর অঞ্চলের সাত আদিবাসী গোষ্ঠীর রক্ত পরীক্ষা করেছিলেন । বার্নস্টেইনের তত্ত্ব মিলিয়ে দেখা গেল – কারুর রক্তই ‘বি’ গ্রুপের রক্ত অর্থাৎ পাচ মিশেলী রক্ত নয় – সবচেয়ে বেশি ‘এ’ গ্রুপের রক্ত ! এই তথ্যের সত্যাসত্য জানা যায় অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষণা থেকে আর ডি এন মজুমদারের লেখা ‘রেসেস আন্ড কালচারস অব ইন্ডিয়া’ বই থেকে !
আদিকাল থেকে অসুরদের ভাষা ‘আসুরি’ ভাষা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে বাংলা কথ্য ভাষা বা প্রাকৃত ভাষা । অক্ষর তৈরির আগে নিজস্ব যে লিপি ছিল – তা ‘কিউনিফর্ম’ অর্থাৎ ‘কিলকাক্ষর’ – রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ বইতে লিখেছেন । এই আসুরি লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে ১১২০ খৃস্ট-পূর্বাব্দে ‘আসিরিয়ার টিপলাথ-পিলেসারে’ এক শিলালেখাতে । যাতে লেখা আছে – ‘হাত্তির সামনে আরাজিকির কাছে মিত্তানি মরুভুমিতে আমি লোহার তির ও বিশাল ধনুক দিয়ে ৪ টি বন্য প্রানী মেরেছি’ ! – এই আসিরিয়া দেশই হল – মুল অসুর সভ্যতার আরেক নিদর্শন । আর এরাই তিন চারটি পর্যায় ভারতে আসেন । - যাকে ‘অ্যালপাইন’, ‘আদি নর্ডিক’ ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়েছে !
অসুরদের আদি ঈশ্বর হলেন ‘মহাদনিয়া’ ! মহাদনিয়াই - মহাদেব বা শিব নামে পুজো পেয়ে থাকেন । সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা বলেন ‘রুদ্র’ – ভারতবর্ষের ‘আদি ঈশ্বর’ ! আর সবচেয়ে চতুর বা ছল চাতুরিতে দক্ষ ঈশ্বর হলেন ‘বিষ্ণু’ বা নারায়ণ – ইনি হলেন মুন্ডাদের ‘সিং বোঙ্গা’ । এঁর ওপর ভিত্তি করে লেখা হয় একপেশে পুরাণ, ইতিহাস, মহাকাব্য ও গীতা ! আসলে ইতিহাস তো অ্যাবসল্যুট সত্য নয় ! ইতিহাস একক শব্দ নয় ! ‘ইতি হ আস’ , অর্থাৎ ‘এইরকম ছিল’ ! কাজেই প্রত্যেক কালেই কয়েকজন পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞ মিলে যে সিদ্ধান্ত নেন তাই চাপিয়ে দেওয়া হয় – ইতি হ আস – ইতিহাস নামে ! কাজেই আসুরিক ইতিহাস মিলবে সাধারন ইতিহাসের প্রচলিত কাহিনীর সঙ্গে ! এই ইতিহাস পড়তে হলে ‘ঋক-বেদ’ ও পুরানের সঙ্গে আসুরিক পুরাণ কাহিনি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে !
ঋকবেদ আসলে এককভাবে কেউ লেখেন নি। বিভিন্ন ঋষির বংশধরেরা একেকটি সূক্ত লিখেছেন । আর এদের প্রায় সকলেই অসুর কুলের বংশধর । যেমন প্রথম মণ্ডলের ২৪ সুক্তে আমরা দেখি ‘বরুন’ সম্বন্ধে ‘অসুর’ শব্দ প্রয়োগ হচ্ছে ।
সংস্কৃত ভাষার আদি যুগে ‘অসুর’ শব্দের অর্থ ছিল ‘প্রানবন্ত তেজদীপ্ত পুরুষ’ । অসুর শব্দের উৎপত্তি ‘অস’ ধাতু থেকে – যার মানে হল শক্তি, ছোড়া ও এগোনো । এই অস ধাতু থেকেই এসেছে অসি, অস্ত্র ইত্যাদি ! আর প্রাচীন পারসিক ভাষায় অশ হল ত্রয়াত্মক অনুশাসন, যা দৈহিক মানসিক ও নৈতিক স্তরে জীবনের অভিব্যক্তিকে পরিচালনা করে ! তাই ‘আবেস্তা’ ধর্মগ্রন্থে অসুরদের নাম – ‘আহুর মাজদা’।
আচার্য সুকুমার সেনও তাঁর ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ বইয়ে ‘অসুর’ একটি মৌলিক শব্দ বলেছেন ! প্রথম অক্ষরকে নঞর্থ উপসর্গ মনে করে বিষমচ্ছেদের ফলে (আর্য প্রয়োগে) সুর 😊 দেবতা ) শব্দ উৎপন্ন । কাজেই সুর নামে কোন শব্দের অস্তিত্ব গুপ্ত যুগে অর্থাৎ সাম্প্রতিক কালে উদ্ভূত – তাই সুপ্রাচীন কালের সুর-অসুরের লড়াই যে নিছক কাল্পনিক – তা বোঝাই যাচ্ছে ! – সমুদ্র মন্থনের পর সুর-অসুরের লড়াই ও দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনি কোন ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই ! এ সব পুরাণকারদের নিছক অক্ষমের বিকৃত কল্পনা !
সায়নাচার্যের মত অনুসারে – অসুর জাতি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উন্নত ছিল । অসুর শব্দের অর্থ তিনি করেছেন ‘বলবান’, ‘প্রজ্ঞাবান’, ‘শত্রুনাং নিরসিত’ ও ‘প্রাণস্য দাতা’ । হরিচরন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বইয়েও এই অর্থই পাওয়া যায় । ঋকবেদেও এই অর্থ প্রযুক্ত হয়েছে । - প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে অসুর গোষ্ঠীকে ‘নিষাদ’ যার মানে করলে – ‘যাদের মধ্যে কোন খাদ নেই’ – যারা পাঁচ মিশেলি জাতি নয় । তাই খৃস্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকে পাণিনি সংস্কৃত ব্যাকরন তৈরির সময়ে লিখেছিলেন ‘নিষাদপঞ্চমা পঞ্চ জনাহ’ অর্থাৎ ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্র ও নিষাদকে ধরে সমাজে পঞ্চ বর্ণ হয় ! পরে পুরাণকালে ব্রাহ্মন্য ধর্ম জাঁকিয়ে বসলে ‘নিষাদ’ গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে চতুর্বর্ণ ও জাতিভেদ প্রথা চালু হয় ।
খৃস্টপূর্ব ৩২৪ থেকে ৩০০ অব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের যুগে ‘রামায়ন’, ‘মহাভারত’, ‘ভাগবদ গীতা’ গ্রন্থে নতুনভাবে অনেক কিছু গুঁজে দেওয়া হল ! তখনই জন্মান্তর বাদের সঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়েছে ‘কর্মবাদ’। আর এইসঙ্গে শব্দের প্রাচীন অর্থও বিকৃত করা হয় । পতঞ্জলী অসুর জাতিকে যে অর্থে ‘মুধ্রাবাচহ’ (‘দুর্বোধ্য ভাষার লোক’) ও ‘ম্লেচ্ছ’ (ব্যকরনে অজ্ঞ ) – তাহলে শব্দগত ভাবে অর্থ হল ‘অস্পৃশ্য’ অর্থাৎ ‘ছোঁয়াও পাপ’ ! – কিন্তু আসুরি ভাষা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ! ব্যকরনও ভিন্ন । অমরকোষে অসুরদের যে ‘পূর্বদেবঃ’ অর্থাৎ ‘প্রাচীন কালের দেবতা’ বলা হয়েছে – পণ্ডিতরা তা পড়েও দেখেন নি !
অসুর জাতিই কি আদি ভারতের আদিমতম স্তর ? এ ব্যাপারে উল্টো মতই কিন্তু নৃতত্ত্ব ও পুরানে আছে । ‘অসুর কাহিনি’তে এ বিষয় কোন আলোচনা নেই । নৃতত্ত্ববিদদের মতে, ভারতীয় জনসৌধের প্রথম স্তর হল ‘নেগ্রিটো’ বা ‘নিগ্রোবটু’ জন । আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ও মালয় উপদ্বীপে যে নেগ্রিটো কৌমের বসবাস ছিল – এ তথ্য বহু পুরনো ।
অসুর জাতির অস্তিত্ব কিন্তু সেই মেহেরগড় সভ্যতা থেকেই রয়েছে । এর পর হরপ্পা সভ্যতাতেও অসুরদের অস্তিত্ব । আবার হরপ্পা সভ্যতাকে বুঝতে হলে ভারতের সনাতন ধ্যান ধারনা বোঝা দরকার ! ভারতবর্ষ চিরকালই নানান কউম বা গোষ্ঠী, নানান ধর্ম, নানান সংস্কৃতি ও নানান ভাষার মিলনক্ষেত্র । কুশান যুগ থেকে সুলতান যুগ, মুঘল যুগ ও বর্তমান ভারতে যেমন বিভিন্ন ভাষাভাষী, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতি মিলে ভারতীয়, ঠিক তেমনই হরপ্পা সভ্যতার ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম নয় ! হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল মুন্ডা, সান্তাড়, হো , ওঁরাওদের মত আদি বাসিন্দাদের নিয়ে । প্রাচীন পুরাণ ‘অসুর কাহিনি’তে বলে এদের নেতৃত্বে ছিল অসুর গোষ্ঠী । তাই আধুনিক পুরানে অন্য কোন আদিবাসী গোষ্ঠীকে শত্রু না মনে করে অসুর জাতিকেই তুলে ধরা হয়েছে শত্রু হিসেবে ।
হরপ্পা সভ্যতাকে দ্রাবিড় সভ্যতা বলাও সত্যের অপলাপ । সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর ‘প্রাচীন ভারত’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আজকের ভারতবর্ষের যে ভোগলিক সীমা, তার বহু পূর্বে ভারতবর্ষের সীমা মধ্য প্রাচ্যের দিকে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল । শুধু বাণিজ্য সীমায় নয় সংস্কৃতিক আদান প্রদানের ভিত্তিতে জাতিগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠী এক না হলেও উত্তর পশ্চিম প্রদেশ ছাড়িয়েও বিরাট বিস্তৃতি ছিল । হয়ত কেন্দ্রিয় কোন শাসন ব্যবস্থা ছিল না ! কিন্তু হাজার হাজার বছরের এই বিস্তৃত অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থার হাত বদল হয়েছিল ।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ডক্টর অতুল সুর ‘সিন্ধু সভ্যতার স্বরূপ ও সমস্যা’ বইতে একই কথা বলেছেন – ‘কেন্দ্রসমুহে রাজারাজড়ার বাস করার মত কোনও রাজপ্রাসাদ পাইনি – তা থেকে মনে হয়, রাজারাজড়ার পরিবর্তে সঙ্ঘ দ্বারাই নগরসমুহ শাসিত হত !’ --- ‘পশ্চিমবঙ্গের দুই স্থানে খননকার্য চালানোর ফলে তাম্রাশ্ম সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে । তাঁর মধ্যে একটি স্থান বর্ধমান জেলার ‘পান্ডুরাজার ঢিপি’ ও অপরটি হল ‘বীরভূম জেলার ‘মহিষদল’ । - এই মহিষদল শব্দটি কিন্তু মহিষ কাল্টের দ্যোতক !তাই স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান এই অঞ্চলের মহিষ-টোটেম গোষ্ঠীর, অর্থাৎ অসুর জাতির সভ্যতা ছিল । মোহেন জো দড়ো থেকে ব্রোঞ্জে গড়া প্রায় ৭ সেন্টি মিটার লম্বা একটি অসাধারন প্রানবন্ত মহিষের মূর্তি পাওয়া গেছে । এখন এটি দিল্লির জাদুঘরে আছে !
প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ আর হল তাঁর ‘দ্য এন্সেন্ট হিস্ট্রি’ বইয়ে লিখেছেন ‘প্রায় ৩০০০ খৃস্টপূর্বাব্দে ভারতেরই এক জনগোষ্ঠী উত্তর-পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে গিয়ে প্রাচীন কালের ব্যাবিরুশ (ব্যাবিলন ) ও ঐরান (ইরান) দখল করে । এই জনগোষ্ঠীই ভারত থেকে ভুমধ্যসাগরের তীরে ফিনিশিয়, আসিরিয় ও মেসোপটেমিয় সভ্যতা গড়ে তোলে । অসিরিয় ও বাবিরুশ শব্দ অসুর শব্দ থেকে উদ্ভূত – তাতে কোনও সন্দেহ নেই । রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ বইয়ে আরও খোলসা করে লিখে গেছেন, বাবিরুশ ও আসুরের প্রাচীন অধিবাসীগন সেমেটিক জাতিয় । ৩০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে ভিন্ন বংশজ সুমেরীয় জাতি – এই আদিম অধিবাসীগণকে পরাজিত করিয়া নতুন রাজ্য স্থাপন করিয়াছিল । বাবিরুশের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অনেক প্রাচীন প্রতিমূর্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে । তাহা দেখিয়া মনে হয় যে তাহা সেমেটিক বা আর্যসম্ভূত নহে । বাবিরুশ অধিকার করিবা্র সময় তারা ধাতব অস্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্ত । অঙ্কিত সাংকেতিক চিহ্ন দ্বারা তারা ভাব প্রকাশ করিতে শিক্ষা করিয়াছিল ও নানাধরনের শিল্প তাহাদের আয়ত্তে ছিল।
কিছু চমকপ্রদ উদ্ধৃতি দিচ্ছি !
পাণ্ডবেরা ময়দানবকে দিয়ে এমন বাড়ি তৈরি করেছিলেন, যার মেঝের ঝাঁ চকচকে রূপ দেখে – জলে পা দিচ্ছেন মনে করে দুর্যোধন কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন ! – শরৎচন্দ্র এই কাল্পনিক ঘটনার বাস্তব অস্তিত্ব পেয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের আজিমগড়ে । আজিমগড় থেকে ২৪ মাইল দূরে ঘাসিতে মাটি খুঁড়ে এমনই এক বিশাল মাটির দুর্গের সন্ধান পান । স্থানীয়রা এই দুর্গ অসুরদের বলে বিশ্বাস করে । এখানে খনন করে দেখা যায়, এককালে এই অঞ্চলের সঙ্গে কুনওয়ার ও মুঙ্গি নদীর সংযোগ ছিল । তাই আজও ‘অসুরীন’ রয়েছে ।
এবারে অসুর জাতির কথা । যুগ যুগ ধরে ছোটনাগপুরের পালামৌ জেলায় পাহাড়ি উপত্যকায় – বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের আমরা – অসুররা রয়েছি । আমাদের শাখা মুলত তিনটি – বীর অসুর, বীরজিয়া আর আগারিয়া । বিহারে রয়েছে বিরজীয়া গোষ্ঠী তফসিলি উপজাতি হিসেবে । আগারিয়া গোষ্ঠী আছে মধ্য প্রদেশে । আমরা কিন্তু বীর অসুরগোষ্ঠীর মানুষ ! রাচী আর পালামৌ জেলা জুড়ে ১০,৭১২ জন রয়েছি । আর পশ্চিমবঙ্গের পুরুল্যা জেলায় কাশীপুর থানার ঝালাগউরা ও উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জে আমাদের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও পরবর্তী কালে আমরা মুল স্রোতে মিশতে পারিনি বলে শিক্ষার হার মাত্র ১০‘৬৬%!
অসুর জাতির আদি ইতিহাস যেমন ‘অসুর কাহিনিতে’ আছে, তেমন সারা বিশ্বে কাছে তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনজন বাঙ্গালীর অবদান আছে । রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ডক্টর অনন্ত প্রসাদ ব্যানার্জী-শাস্ত্রী ও শরৎচন্দ্র রায় । ভারতের আদি ইতিহাস লুকিয়ে আছে মুলত হরপ্পা সভ্যতার মধ্যে । বৈদিক সভ্যতা এসেছে তার অনেক পরে । ১৯২৪ সালে স্যার জন মার্শাল ‘ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ’ পত্রিকায় এই হরপ্পা সভ্যতার সচিত্র বিবরন বের করেন ।
হিন্দু ধর্মের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আজকে হিন্দুত্ব বলতে যা বোঝায় – বেদ উপনিষদের যুগে কিন্তু ভিন্নতর ছিল । কয়েক শতাব্দী ধরে নানান পরিবর্তনের মাধ্যমে হিন্দুত্বের উদ্ভব ! পূর্বে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা, যজ্ঞ, বলিদান ও স্তোত্রপানের ছন্দ আর ধ্বনিকেই প্রাধান্য দিত নিশ্চিত ফলাদায়ি মনে করে ! – পরবর্তী কালে অন্তর্মুখী, কল্পনাপ্রিয় চিন্তা – মানুষের চেহারায় মূর্তি, রহস্যময়তা, ঐশ্বরিক শক্তি ইত্যাদিকে বিশেষ গুরুত্ব পেল । ইন্দ্র, বরুন, মরুত ও অগ্নির বদলে এসে গেল মানুষিক চেহারার দেব-দেবী ! মন্দির । ভক্তির প্রাবল্যে দেশ ভাসতে লাগল । আর ঋক বেদের স্রস্টা অসুর কিল্লির (কুলের) বাইগারা (দৈবশক্তির অধীশ্বর) সংমিশ্রণের ফলে কুলপুরোহিত আখ্যায়িত হল !
জয় সাহার প্রতিবেদন (এই সময় ) -
সারা দেশ যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মত্ত – ঠিক সেই সময়েই অন্ধকারের অবহেলিত এক আদিম জাতি – সারা দেবীপক্ষ নিজেদের বাসায় অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বসে শোক প্রকাশ করে ! কারন তারা মনে করে – মহিষাসুরের মৃত্যু আসলে একটা জঘন্য চক্রান্ত ! বিদেশ থেকে আগত তথাকথিত আর্যরা ভারত দখলের সময়ে প্রাচীন মগধ, বঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে অসুর রাজাদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না ! মহিষাসুরের মত এক পরাক্রমশালী রাজাকে ছল করে এক সুন্দরী রমণীকে বিয়ে করিয়ে – বিয়ের নবম রাতে তাকে হত্যা করে ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পরে দেবী দুর্গার বিজয় কাহিনী বলে প্রচার করে । কালক্রমে সেটাই একটা আরজদের উৎসবে পরিনত হয় ! – যদিও এই কাহিনীর কোন প্রামান্য পাঠ্য হিসেবে পাওয়া যায় না – পুরো ঘটনাটাই আদেবাসীদের নিজস্ব লোকগাথা !
পুরানবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর বক্তব্য ‘মহিষাসুর বোধ আসলে শুভ ও অশুভের মধ্যে লড়াই ।‘ - নৃতত্ত্ববিদ পশুপতি মাহাতো বক্তব্য –‘ বেদ পুরানে অসুরের ইতিহাস না থাকাটাই স্বাভাবিক। ব্রাহ্মন্যবাদীদের এই একমুখীতার বিরুদ্ধে দলিত মানুষেরা বহুদিন কোন কথা বলতে পারেন নি ‘!
দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অনেকদিন ধরেই আদিবাসী মানুষেরা অসুর উৎসব বা অসুর স্মরণসভা পালন করে আসছে ! ক্রমশ আরও আরও মানুষ এই স্মরনসভায় সামিল হচ্ছে ! এ বছর রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রায় সাড়ে আটশো থেকে ন-শো স্মরনসভা পালিত হবে ! এগুলো ফল করার জন্যে কো- অরডিনেশান কমিটি গড়ে তোলা হয়েছে ! ঠিক হয়েছে দলিত-প্রান্তিক, আদিবাসী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের সামিল করা হবে ! এই স্মরনসভাগুলোতে মুলত যুদ্ধবিরোধী শোভাযাত্রা, আদিবাসী নৃত্য, অসুর ও দুর্গাপুজা নিয়ে আলোচনা করা হবে !
সুমনা চক্রবর্তী ও সঞ্জিত গোস্বামির প্রতিবেদন (এই সময় )
মহিষাসুরকে অন্যায়ভাবে খুন করা হয়েছে – এই বিশ্বাসে অসুরকুলের নানা উপজাতি দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে ঘরে আলো জ্বালায় না । পুরুলিয়ার খেরোআলরা ‘হুদুরদুর্গা’ উৎসব নিয়ে । হুদুরদুর্গা কিন্তু দুর্গা নয় – নারীও নয় ! ওদের ভাষায় হুদুর মানে – পরাক্রমশালী বীর ! এই হুদুরদুর্গাকে ছল করে হত্যা করা হয় !
পুরুলিয়ার ভালাগোরা গ্রামে ২০১১ সাল থেকে হুদুরদুর্গার পুজো চালু হয়েছে । মহিষাসুরের মূর্তি গড়ে পুজো হয় । পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক চারিয়ান মাহাতো বলেন – ‘হুদুরদুর্গার পুজো হওয়ার পর দিল্লির জে এন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সম্পাদক জিতেন্দ্র যাদব ছবি এঁকে সমর্থন জানিয়েছিল ‘। - খেরোয়ালদের মুখে মুখে প্রচলিত গানে গানে বার বার ফিরে আসে পুরনো ইতিহাস ! চ্যাঁইচম্পা বা চম্পা ছিল ওদের বাসভূমি । আর্য দের দখলদারি শুরু হলে হুদুরদুর্গার সঙ্গে যুদ্ধে পেরে না ওঠায় ছলের আশ্রয় নেয় । মহিলার সঙ্গে লড়াইয়ে নীতিগত আপত্তি ছিল হুদুরদুর্গার ! তাই তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নবম রাতেই তাকে হত্যা করা হয় !
যেহেতু আর কোনও নেতা ছিল না ঐ উপজাতির – তাই ধর্মগুরুর নির্দেশে সবাই সরস্বতী নদীতে স্নান করে মহিলাদের পোশাক পরে নৃত্যরত ভাবে পূর্ব দিকে পালিয়ে যায় । এই নাচকে দাসাই নাচ বলে ! এর অর্থ অসহায় ! আশ্বিন মাষকেও দাসাই মাস বলে ! এই গানের অর্থ – ‘দুর্গা অন্যায় সমরে মহিষাসুরকে বধ করেছে । হে বীর, তোমার পরিণামে আমরা দুঃখিত । তুমি আমাদের পূর্বপুরুষ । প্রনাম নাও ‘!
নবমীর দিন হুদুরদুর্গার স্মৃতিতর্পণের পর মহিষাসুরের উদ্দেশ্যে ছাতা উত্তোলন করে – ‘ছাতা ধরা’ উৎসব পালন করে । বীর বন্দনার এই উৎসব ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ! – দেশে এখন প্রায় ১৫০ এলাকায় হুদু্রদুর্গা উৎসব হচ্ছে ! – লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপকুমার গোস্বামী বলেন – ‘পুরানের কোন কোন কাহিনীতে মহিষাসুর যুদ্ধের আগে দুর্গাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল । আবার এও ঠিক অসুর নামে একটি উপজাতি গোষ্ঠী ছিল । অদুরদের সঙ্গে দেবতাদের যুদ্ধের কাহিনীও পুরানে আছে !’
আমার স্বীকারোক্তি – মনে হচ্ছে – সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে চোরা স্রোতে অনেক দুর চলে এসেছি ! আর ভেসে উঠতে পারছি না ! এত বড় বড় পণ্ডিত সমাজতাত্ত্বিক প্রত্নতাত্ত্বিক এই ব্যাপার নিয়ে লিখেছেন যে তাদের সারাংশটুকু নিয়েও – আমার এই লেখা শেষ হবে না ! – তাই যত তাড়াতাড়ি পাড়ের কাছে আসা যায় – ততই মঙ্গল !
ইচ্ছে আছে – পরে কোনও সময়ে - অসুর জাতির সঙ্গে বেদ-পুরাণ ইত্যাদির সাদৃশ্য প্রত্নতত্ত্বে আবিষ্কৃত – সে সব নিয়ে আবার আলোচনা করব !

Comments

Popular posts from this blog

” জীবন প্রেমের ফষল। আর প্রেম হলো ”মা”।”